নয় বছর পরও ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান ম্যাক্রোঁর

সরবোনের ঐতিহাসিক ভাষণের নয় বছর পূর্তিতে ইউরোপের ঐক্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ।

PostImage

নয় বছর পরও ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান ম্যাক্রোঁর


ইউরোপকে আরও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার মতো সক্ষম করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের নয় বছর পূর্তিকে সামনে রেখে ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবারও তুলে ধরেছেন তিনি।

২০১৭ সালের সেই ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একটি সার্বভৌম, ঐক্যবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ইউরোপ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমন্বয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে ইউরোপের ভূমিকা জোরদার করা।

ম্যাক্রোঁর সাম্প্রতিক বার্তায়ও ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইউরোপ বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে যৌথভাবে কাজ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মতো পরিস্থিতি ইউরোপের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা, জ্বালানি স্বাধীনতা, শিল্প ও কর্মসংস্থান, মহাকাশ গবেষণা এবং প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতির কথাও ম্যাক্রোঁর বার্তায় গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে ইউরোপকে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাটি অবশ্য ম্যাক্রোঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন নয়। ২০১৭ সালের সরবোন ভাষণেই তিনি বলেছিলেন, ইউরোপকে এমন একটি শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মহাদেশটি নিজের স্বার্থ ও মূল্যবোধ রক্ষায় অন্য শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকে। তিনি তখন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, জ্বালানি, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাকে সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সরবোন ভাষণেও ম্যাক্রোঁ একই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের পর ইউরোপ জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিতে ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব শুধু সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের মতো কৌশলগত ক্ষেত্রও যুক্ত। ২০২৪ সালের বক্তব্যে তিনি ইউরোপের কৌশলগত নির্ভরতা কমাতে সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালসহ বিভিন্ন খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এদিকে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে গত কয়েক বছরে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা তহবিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলিসি প্রাসাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৭ মেয়াদে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা তহবিলের জন্য প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরোর বাজেট রাখা হয়েছে এবং যৌথ প্রতিরক্ষা গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রকল্পে অর্থায়ন করা হচ্ছে।

ফলে নয় বছর আগে সরবোনে ম্যাক্রোঁ যে ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা সামনে এনেছিলেন, সেটি এখনও তাঁর ইউরোপনীতি ও বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কতটা সফলভাবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও নীতিগতভাবে বিভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে। ম্যাক্রোঁর বক্তব্য মূলত ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর