বাণিজ্যযুদ্ধের পর কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন শঙ্কা, সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি শুরু হচ্ছে নতুন যুদ্ধ

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা, বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেই সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি খতিয়ে দেখছেন কার্নি।

PostImage

বাণিজ্যযুদ্ধের পর কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন শঙ্কা, সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি শুরু হচ্ছে নতুন যুদ্ধ


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বাণিজ্য বিরোধ, পাল্টাপাল্টি শুল্ক এবং কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর সম্পর্ক ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার মতো অত্যন্ত কম সম্ভাবনার ঝুঁকিও পর্যালোচনা করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তবে কার্নির বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মধ্যে যুদ্ধ আসন্ন হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে না।

২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্নি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সম্ভাবনাকে ‘এক্সট্রিম টেইল রিস্ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ এমন একটি ঘটনা যার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, কিন্তু ঘটলে তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এমন সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা দায়িত্বশীলতার বিষয়।

দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গা এখন বাণিজ্য। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এর জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা আগস্টে ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।

কানাডার অর্থনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে কানাডার ৫৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭২ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সংঘাত কানাডার ব্যবসা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

বাণিজ্য বিরোধের পাশাপাশি কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়েও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। কানাডার পক্ষ থেকে এসব মন্তব্যকে সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কার্নি তাঁর সরকারের অবস্থান হিসেবে কানাডার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।

আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করার সময় কার্নি বলেছিলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ন্যায্য চুক্তি চায়, তবে কোনো মূল্যে বা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমার চাপে চুক্তি করতে চায় না। একই সঙ্গে তিনি কানাডার অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার তৈরি করার কৌশলের কথা জানান।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে কানাডা ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে কার্নি বলেন, কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বাণিজ্য, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

কার্নির সরকার একই সঙ্গে কানাডার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করার বিষয়ও বিবেচনা করছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর অংশ হিসেবে কানাডা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করছে। একইভাবে দেশটি ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্নির ঝুঁকি পর্যালোচনার অর্থ যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়। বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেওয়ার অংশ হিসেবেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত হলে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিনের সামরিক ও নিরাপত্তা অংশীদার এবং একই উত্তর আমেরিকান প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাণিজ্য বিরোধের বাইরে গিয়ে সামরিক সংঘাতের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের ওপর নয়, উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

বর্তমানে কার্নি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার পথে নেই। বরং বাণিজ্য বিরোধের সমাধানের জন্য আলোচনার দরজা খোলা রাখার পাশাপাশি কানাডার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। কার্নি বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাসের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের গভীর পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাণিজ্য বিরোধ, সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ একসঙ্গে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নির্ভরতা নতুন করে পর্যালোচনা করতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে দুই দেশ এখনো আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর সুযোগ ধরে রেখেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর