কিয়েভে ডেটা সেন্টারে রুশ ড্রোন হামলা, পাল্টা আঘাতে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ
কিয়েভে ডেটা সেন্টারে হামলায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, তবে ব্যাকআপ ব্যবস্থায় সেবা সচল; পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলায় বাড়ছে উত্তেজনা।
কিয়েভে ডেটা সেন্টারে রুশ ড্রোন হামলা, পাল্টা আঘাতে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন একটি দিক সামনে এসেছে কিয়েভের ডিজিটাল ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে ঘিরে। ২৫ সেপ্টেম্বর রুশ ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান ডাটা গ্রুপ -এর একটি ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। হামলার ফলে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হলেও গ্রাহকদের তথ্য নিরাপদ রয়েছে এবং ব্যাকআপ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সেবা চালু রাখা হয়েছে।
ডাটা গ্রুপ জানিয়েছে, হামলার সময় তাদের কোনো কর্মী আহত হননি। প্রতিষ্ঠানটির বিশেষজ্ঞরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে কাজ করছেন। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, আগে থেকেই বিকল্প বা ব্যাকআপ অবকাঠামো প্রস্তুত রাখায় ডেটা সুরক্ষা এবং পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব হয়েছে।
এই ঘটনার গুরুত্ব শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেনের ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা যুদ্ধের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে। সরকারি যোগাযোগ, ব্যবসা, জরুরি সেবা, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম সবকিছুই স্থিতিশীল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডেটা সেন্টার ও নেটওয়ার্ক হাবের ওপর ধারাবাহিক হামলা হলে স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এর আগেও ২৩ সেপ্টেম্বর কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলায় একাধিক ডেটা সেন্টার ও ইন্টারনেট অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ইউক্রেনের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার পর কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় প্রায় এক লাখ পরিবার ইন্টারনেট সমস্যার মুখে পড়েছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩ সেপ্টেম্বরের হামলায় কিয়েভের রেল অবকাঠামো, গুদাম এবং জ্বালানি স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে রুশ ড্রোন। একই সময় রাজধানীর বিভিন্ন অংশে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়।
২৫ সেপ্টেম্বরও কিয়েভে হামলা অব্যাহত ছিল। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি হামলায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ডেটা সেন্টারে হামলাকে যুদ্ধের একটি বিস্তৃত কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা ও কিছু বিশ্লেষক। কারণ আধুনিক যুদ্ধে যোগাযোগ অবকাঠামো শুধু বেসামরিক অর্থনীতির জন্য নয়, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও জরুরি যোগাযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো প্রমাণিত নয়। “জেলেনস্কি রাশিয়ার জনগণের কাছে যুদ্ধ নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এবং তাই রাশিয়া যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন কিয়েভে নিয়ে এসেছে” এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা প্রচারণামূলক বক্তব্য। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন কোনো সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
একইভাবে “ইউক্রেন যত ড্রোন ব্যবহার করবে, কিয়েভের পরিস্থিতি তত খারাপ হবে” এটিও যাচাইযোগ্য তথ্য নয়; এটি একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বা রাজনৈতিক বক্তব্য। বাস্তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষই একে অপরের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ড্রোন ব্যবহার করছে। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি ও অন্যান্য অবকাঠামোর বিরুদ্ধে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ইউক্রেনের ডিজিটাল অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা। একটি ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকলে পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায় না। ডাটা গ্রুপ এর ঘটনাটিও তার উদাহরণ প্রধান অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিকল্প সাইট থেকে সেবা চালু রাখা হয়েছে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে “কিয়েভের ডেটা সেন্টার ধ্বংস” বলার চেয়ে “ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত” বলা বেশি নির্ভুল। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট যে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এখন সামরিক ঘাঁটি বা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও যোগাযোগ, ইন্টারনেট, জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে।
যুদ্ধের এই পর্যায়ে ড্রোন হামলা শুধু তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ বা ভবন ধ্বংসের বিষয় নয়; এগুলো একটি দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জনজীবনের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। কিয়েভের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে। তবে হামলার উদ্দেশ্য ও কৌশল নিয়ে পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদা হওয়ায় রাজনৈতিক দাবিগুলোকে নিশ্চিত তথ্য থেকে আলাদা করে দেখা জরুরি।