ইউক্রেনে বড় মার্কিন বিনিয়োগ নিশ্চিতে নিউইয়র্কে শীর্ষ নির্বাহীদের মুখোমুখি জেলেনস্কি

নিউইয়র্কে শীর্ষ মার্কিন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, শক্তি সম্পদ ও নতুন বিনিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে জেলেনস্কির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

ইউক্রেনে বড় মার্কিন বিনিয়োগ নিশ্চিতে নিউইয়র্কে শীর্ষ নির্বাহীদের মুখোমুখি জেলেনস্কি

ইউক্রেনে বড় মার্কিন বিনিয়োগ নিশ্চিতে নিউইয়র্কে শীর্ষ নির্বাহীদের মুখোমুখি জেলেনস্কি


জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে এক নীতিগত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ত্রিশটিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও সরকারি নীতি নির্ধারকদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। 

 
এই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংলাপে মূল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে আসন্ন শীত মৌসুমে যুদ্ধকবলিত দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং মার্কিন বেসরকারি খাতের পুঁজি সরাসরি ইউক্রেনের কৌশলগত খাতে সম্প্রসারণ করা। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সামরিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যৌথ সরঞ্জাম উৎপাদন, শক্তি সম্পদ তৈরি এবং আধুনিক শক্তি সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হয়েছে।  
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আলোচনার গতিপ্রকৃতি উল্লেখ করে জানান, যুদ্ধের সংকটময় সময়ে ইউক্রেন কেবল আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্য গ্রহণ করেছে। সেই উদ্দেশ্যে মার্কিন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ যুক্ত করে স্থানীয় পর্যায়েই উন্নত সামরিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং আধুনিক ড্রোন উৎপাদনের জন্য যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলার কাজ শুরু হচ্ছে। একই সাথে প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষ্যে অগ্রগতি হয়েছে।  


দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ মূল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ও সাধারণ পরিকাঠামো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে আসন্ন কনকনে শীতের সময়ে নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখা ও মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন শিল্পোদ্যোক্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই বৈঠকে জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং নিরাপদ সঞ্চালন ব্যবস্থার নতুন বিনিয়োগকে কেবল ব্যবসায়িক লাভের চোখে না দেখে জাতীয় স্থিতিস্থাপকতার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।  
অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও জোরদার করতে এবং বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক পুঁজি নিরাপদ করতে বৈঠকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম তহবিল গঠনের সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরা হয়। যুদ্ধকালীন সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থা ও মার্কিন বিমা প্রদানকারীদের যৌথ সহায়তায় විශේෂ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বড় ধরনের বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ব্যাংক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা দূর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।  


উচ্চপর্যায়ের এই ব্যবসায়িক সম্মেলনে বিশ্বের প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেমন সিটি গ্রুপ, ব্ল্যাকরক, ফ্রাঙ্কলিন টেম্পলটন, ল্যাজার্ড, মেকুয়ারি, স্টেট স্ট্রিট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রস্তুতকারক সংস্থা এলথ্রি-হারিস, নর্থরপ গ্রুম্যান, শিল্ড এআই সহ প্রধান বাণিজ্যিক সরবরাহকারী ফেডেক্স-এর নীতি নির্ধারকেরা অংশ নেন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র চেম্বার অব কমার্স, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন কর্পোরেশন, বিশ্বব্যাংক এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের প্রতিনিধি দল সম্মেলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। 

 
বিগত কয়েক বছরের সামরিক সংঘাতের কারণে ইউক্রেনের সামরিক প্রযুক্তি খাতে দেশীয় উদ্ভাবনী সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় প্রকৌশলীদের তৈরি ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবস্থার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিশ্বমানের প্রযুক্তি, বিশাল আর্থিক মূলধন এবং বিশালাকার উৎপাদন ব্যবস্থার সংযোগ ঘটানোকেই এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য বানানো হয়েছে।


রাষ্ট্রপ্রধানের দেওয়া বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, মার্কিন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে হতে যাওয়া এই সমঝোতা কেবল সাময়িক কিছু আর্থিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ববাজারের মূল অবকাঠামোগত চেইন এবং প্রযুক্তি আদানপ্রদানের মাধ্যমে এটি উভয় দেশের জন্যই সুবিধাজনক ব্যবসায়িক ক্ষেত্র উন্মোচন করবে। তবে কৌশলগত নিরাপত্তাজনিত কারণ এবং চুক্তির চূড়ান্ত দরকষাকষি চলমান থাকার দরুন ঠিক কত বিলিয়ন ডলার কোন নির্দিষ্ট কারখানায় বা প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে, সেটির প্রকৃত হিসাব বিস্তারিত প্রকাশ থেকে বিরত থাকা হয়েছে।  


মার্কিন বাণিজ্যিক নেতৃবৃন্দের সাথে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা মূলত ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ। চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের মাঝেও দেশটির সরকার এটি প্রমাণ করতে চাইছে যে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে বিশাল অঙ্কের পুঁজি প্রয়োজন হবে, যার প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে এখন থেকেই বেসরকারি খাতকে আকৃষ্ট করার সার্বিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।


আন্তর্জাতিক আর্থিক বিষয়ক প্রধান সংস্থাগুলির পর্যবেক্ষণ অনুসারে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেক বহুজাতিক ব্যাংক বিশ্ববাজারে ঝুঁকিপূর্ণ মূলধন প্রদানে বেশ সতর্ক অবস্থানে থাকে। কিন্তু ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্প, স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রযুক্তি ও দ্রুত গতিতে বর্ধনশীল জ্বালানি অবকাঠামো এখন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। সেই কারণে প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেখানে স্টার্টআপ তহবিল, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং বড় যৌথ উদ্যোগে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।  


বিনিয়োগকে বাস্তব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সার্বিক বিমা প্রতিরক্ষা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে কাজ করে। ভৌত সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ অর্থায়নে সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকিং সংস্থাগুলো এরই মধ্যে অবকাঠামো খাতে সংস্কার আনতে কোটি কোটি মার্কিন ডলার অনুমোদন করেছে, যার বিশাল একটি অংশ ইউক্রেনের সরবরাহ শৃঙ্খলা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।  


নিউইয়র্কের বিশ্ব রাজনীতিতে এই সফরের সময়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং বৈশ্বিক শান্তি রূপরেখা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সংলাপ জোরদার করেছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। জাতীয় অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এখন এক সুতোয় গাঁথা, আর সে কারণেই বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালুর এই বহুমুখী প্রচেষ্টা জোরালো ভূমিকা পালন করবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর