নিহত নারী-শিশুদের ছবি তুলে ধরলেন পেজেশকিয়ান, বিশ্বনেতাদের প্রশ্ন?
নিহত নারী-শিশুদের ছবি জাতিসংঘে তুলে ধরলেন পেজেশকিয়ান, বিশ্বনেতাদের প্রশ্ন—ইসরায়েলি হামলা ও গাজার মানবিক বিপর্যয়েও কি আপনারা চোখ বন্ধ রাখবেন?
নিহত নারী-শিশুদের ছবি তুলে ধরলেন পেজেশকিয়ান, বিশ্বনেতাদের প্রশ্ন?
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও মানবিক সংকট যখন আলোচনার কেন্দ্রে, তখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে গাজা ও ইরানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি সামনে এনেছেন। বক্তব্যের সময় ইসরায়েলি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহত বলে দাবি করা নারী, শিশু ও অন্যান্য বেসামরিক মানুষের ছবি প্রদর্শন করে তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন—এ ধরনের হামলার দিকেও কি বিশ্ব চোখ বন্ধ করে থাকবে?
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে পেজেশকিয়ান গাজার পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ শুধু হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন না, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। বক্তব্যে তিনি গাজায় অন্তত ৩৫ হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কথা উল্লেখ করেন। সংখ্যাটি তাঁর বক্তব্যে দেওয়া দাবি; গাজা যুদ্ধের বিভিন্ন সময় ও পর্বের হতাহতের হিসাব আলাদা হওয়ায় এটিকে তাঁর উদ্ধৃত পরিসংখ্যান হিসেবেই দেখা উচিত।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের মানবিক সংকটসংক্রান্ত অংশের সঙ্গে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেরও মিল রয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ও ইউনিসেফ জানিয়েছে, গাজায় সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় শিশুরা নিহত হয়েছে, পুষ্টিসামগ্রী ধ্বংস হয়েছে এবং হাজারো মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুলাইয়ে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ আগের মাসের তুলনায় বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এবং বিভিন্ন জরুরি সামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধ রয়ে গেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার পানি সংকটও গুরুতর। ২০২৬ সালের আগস্টে পরীক্ষিত পানির নমুনায় জীবাণু দূষণের হার বছরের শুরুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বহু মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা এখনও পানি বহনকারী ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল।
ইরানি প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের ওপর হামলার ঘটনাও জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেন। নিউইয়র্কে যাওয়ার আগেই তিনি ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাবে ওই হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন স্কুলশিশু ছিল।
পেজেশকিয়ান এমন এক সময়ে জাতিসংঘে এসেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যেই তিনি নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন এবং তাঁর সফরে সংঘাতের পাশাপাশি কূটনীতিতে ফেরার সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ অধিবেশনকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখছে তেহরান। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইরানের প্রতিনিধিদল আলোচনা পুনরায় শুরু করার ক্ষমতা নিয়ে নিউইয়র্কে গেছে, যদিও পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা জানা যায়নি।
এর আগে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের এক বৈঠকেও পেজেশকিয়ান গাজা, লেবানন ও ইরানের পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, বিরোধ নিষ্পত্তির প্রধান পথ হিসেবে ইরান এখনও কূটনীতি ও আলোচনাকেই বিবেচনা করে; তবে সেই কূটনীতির জন্য প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শুধু ইরানের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, গাজায় যে মাত্রায় মৃত্যু ও ধ্বংস হয়েছে, মহাসচিব হিসেবে তাঁর দায়িত্বকালে এমন পরিস্থিতি তিনি দেখেননি। তিনি যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তার প্রবাহ নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের সামরিক অভিযান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে এবং বেসামরিক প্রাণহানি এড়াতে তারা ব্যবস্থা নেয়। হামাস বেসামরিক এলাকাকে সামরিক কাজে ব্যবহার করে—ইসরায়েলের এমন অভিযোগ হামাস অস্বীকার করে আসছে।
ফলে পেজেশকিয়ানের এবারের জাতিসংঘ ভাষণ শুধু গাজা নিয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, আন্তর্জাতিক আইন এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কূটনীতির সম্ভাবনাও তাঁর নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।