বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের বার্তা: মানুষই সমাধান তৈরির সবচেয়ে বড় শক্তি
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের খলিলুর রহমানের বার্তা, ‘মানুষ সমস্যা নয়, সমাধানের শক্তি’ যুব নেতৃত্ব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দিলেন বিশেষ জোর।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের বার্তা: মানুষই সমাধান তৈরির সবচেয়ে বড় শক্তি
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, বৈষম্য, জলবায়ু বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানুষকে ‘সমস্যা’ হিসেবে না দেখে সমাধান তৈরির সক্ষম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-১-এ ‘সামাজিক ব্যবসা, যুবসমাজ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ পাঠও প্রকাশ করা হয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্বে সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংঘাত, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রযুক্তিগত অস্থিরতা ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তাই শুধু সংকট দেখা দিলে প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে যেসব ব্যবস্থা বারবার বৈষম্য ও দুর্বলতা সৃষ্টি করছে, সেগুলোর মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির অগ্রগতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩০ শতাংশের কিছু বেশি সঠিক পথে রয়েছে। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের জন্য হাতে রয়েছে আর মাত্র চার বছর। এই সময়ের মধ্যে উন্নয়ন অর্থায়নকে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক ব্যবসাকে একটি কার্যকর পথ হিসেবে তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান। তাঁর মতে, সামাজিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে উদ্যোক্তাসুলভ দক্ষতা ও উদ্ভাবন যুক্ত করা গেলে স্বল্পমেয়াদি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বনির্ভর সমাধান গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছেও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
ক্ষুদ্রঋণের অভিজ্ঞতার কথাও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। অল্প পরিমাণ পুঁজি ও মানুষের ওপর আস্থা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের—বিশেষ করে নারীদের—সৃজনশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ ২০০৫ সালকে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল বলেও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মানুষকে ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে না দেখে সমাধানের স্রষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসা ও মানুষের নিজস্ব সক্ষমতার ওপর আস্থার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
অনুষ্ঠানটির এবারের আয়োজন ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ঘিরে ‘সামাজিক ব্যবসা, যুবসমাজ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানের ১১তম সংস্করণ। জাতিসংঘ ওয়েব টিভির তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর এবং সামাজিক ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের নেতা, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও তরুণদের এতে যুক্ত করা হয়।
যুবসমাজের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, তরুণদের অংশগ্রহণ কেবল পরামর্শ দেওয়া বা বিভিন্ন কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী হিসেবে যুক্ত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাদের সরাসরি নেতৃত্ব এবং নীতি তৈরির প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, তরুণদের “অংশগ্রহণ থেকে নেতৃত্বে” এগিয়ে যেতে হবে—অর্থাৎ শুধু মতামত দেওয়ার পরিবর্তে নীতি তৈরিতে অংশ নেওয়া, কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি নিজেরাই উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং পরিবর্তনের দাবি করার পাশাপাশি সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—দুই দিকই তুলে ধরেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি। তাঁর মতে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এআই নৈতিক, পরিবেশগত এমনকি মানব অস্তিত্বের ক্ষেত্রেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তবে সঠিকভাবে পরিচালিত, ন্যায়সংগতভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত এবং কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা গেলে এই প্রযুক্তি টেকসই উন্নয়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ, টিকা উদ্ভাবনের গতি বাড়ানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা এবং আর্থিক সেবায় মানুষের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাকি চার বছরে এআইকে এসডিজি বাস্তবায়নের একটি শক্তিশালী ত্বরান্বিতকারী হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. খলিলুর রহমান।
তবে এআইয়ের সুফল যেন শুধু প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর কয়েকটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো যাতে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে এবং এর সুফল পেতে পারে, সে জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকেন্দ্রিক এআই শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এআই শাসনকে নিজের সভাপতিত্বের অন্যতম অগ্রাধিকারও করেছেন ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ছয়টি প্রধান অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু ও পরিবেশ, মানবাধিকার ও মানবিক সুরক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার।
জাতিসংঘের এআই-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় ডিজিটাল বৈষম্য কমানো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এআই ব্যবস্থাপনায় সব দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক এআই শাসন নিয়ে সংলাপকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ড. খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। গোপন ভোটে তিনি ৯৯ ভোট পান এবং সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকুরিস পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ভোট পড়ে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পালা অনুযায়ী এবারের সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
৮ সেপ্টেম্বর ৮১তম অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে তাঁর সভাপতির মেয়াদ কার্যকর হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমান তিন দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করেছেন এবং এর আগে সাধারণ পরিষদের ১৬টি অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
৮১তম অধিবেশনে তাঁর মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’। এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিভক্তির মধ্যেও ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা এবং জাতিসংঘকে মানুষের বাস্তব প্রয়োজন পূরণে আরও কার্যকর করে তোলা।
‘সামাজিক ব্যবসা, যুবসমাজ ও প্রযুক্তি’ অনুষ্ঠানের বক্তব্যেও সেই দর্শনের প্রতিফলন দেখা গেছে। সংকটের পর সংকট মোকাবিলা করার পরিবর্তে সংকট সৃষ্টিকারী কাঠামোর পরিবর্তন, দাতব্য সহায়তা থেকে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তরুণদের অংশগ্রহণ থেকে নেতৃত্বে নিয়ে আসা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্যের পরিবর্তে সবার জন্য ডিজিটাল সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বজুড়ে দ্রুত পরিবর্তিত অর্থনীতি ও প্রযুক্তির বাস্তবতায় ড. খলিলুর রহমানের মূল বার্তা ছিল—উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষকে রাখতে হবে। মানুষকে শুধু সহায়তা গ্রহণকারী হিসেবে নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগ, পুঁজি, দক্ষতা ও প্রযুক্তি পেলে নিজের এবং সমাজের সমস্যার সমাধান তৈরিতে সক্ষম অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আর ২০৩০ সালের লক্ষ্য সামনে রেখে যুব নেতৃত্ব, সামাজিক ব্যবসা ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তিকে সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বাংলাদেশি সভাপতি।