বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার অভ্যাসই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অর্থ ব্যবস্থাপনার সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা ও স্বাবলম্বিতা অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার অভ্যাসই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার অভ্যাসই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা


বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পা রাখার মুহূর্তটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনপথের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। পাঠদানের পরিবেশ, নতুন সামাজিক যোগাযোগ এবং উচ্চশিক্ষার নানা দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ মন প্রথম প্রত্যক্ষ আর্থিক স্বাধীনতার স্বাদ পায়। পরিবারের তরফ থেকে আসা মাসিক খরচ, নিজের কষ্টার্জিত গৃহশিক্ষকতার পারিশ্রমিক কিংবা বিভিন্ন খণ্ডকালীন কাজের আয় হাত ধরে জীবনের নিজস্ব সিদ্ধান্তের সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এই স্বাধীনতার আনন্দের সাথে যুক্ত হয় বিশাল দায়বদ্ধতা। সঠিক পূর্বপরিকল্পনা ও বিচক্ষণতার অভাব ঘটলে মাস শেষ হওয়ার অনেক আগেই ভয়াবহ আর্থিক অনটন ও দুশ্চিন্তা গ্রাস করে ফেলে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অর্থ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যক্তিগত ফাইন্যান্সিয়ালি স্বাধীন হওয়া কোনো হঠাৎ পাওয়া সুযোগ নয়, বরং এটি নিয়মিত মানসিক অনুশীলনের ফল। উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীর উচিত নিজের প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার টেকসই কৌশল অর্জন করা।
তথ্য যাচাই ও বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের সর্বজনগ্রাহ্য নীতিগুলো ক্যাম্পাস জীবনের প্রেক্ষাপটে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য। অর্থবিষয়ক খ্যাতনামা লেখক ডেইভ র‍্যামসির শূন্যভিত্তিক বাজেট পরিকল্পনায় প্রতি মাসের শুরুতে সম্ভাব্য সর্বমোট আয়ের সমপরিমাণ অর্থকে নির্দিষ্ট খাতগুলোতে বিভক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে। গৃহশিক্ষকতা, বৃত্তি, ফ্রিল্যান্সিং বা পরিবার থেকে প্রাপ্ত মোট অর্থ খাতওয়ারী নির্ধারণের পর অবশিষ্ট অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা কিংবা সঞ্চয় তহবিলে স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে। অপরদিকে আমেরিকান অর্থনীতিবিদ এলিজাবেথ ওয়ারেন ও তাঁর কন্যা ২০০৫ সালের গবেষণামূলক গ্রন্থে যে বিখ্যাত বাজেট সূত্র তুলে ধরেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস বা মেসের খরচের ক্ষেত্রে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখে। আয়কে প্রধানত তিনটি অংশে ভাগ করে সর্বমোট অর্থের অর্ধাংশ অত্যাবশ্যকীয় ব্যয় অর্থাৎ মেসের সিট ভাড়া, খাবার খরচ, পড়াশোনার সামগ্রী ও যোগাযোগের মোবাইল রিচার্জে সীমাবদ্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত। ব্যক্তিগত পছন্দ, ঘুরে বাড়ানো, আড্ডা কিংবা চিত্তবিনোদনের পেছনে ৩০ শতাংশের বেশি বরাদ্দ না দিয়ে বাকি ২০ শতাংশ অর্থ ভবিষ্যতের নিরাপত্তায় সরিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।


দৈনন্দিন জীবনের হঠাৎ তৈরি হওয়া ঝোঁক বা আবেগের বশে অহেতুক পণ্য কেনাকাটার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক আচরণগত অর্থনীতির নীতি অনুসারে, আকর্ষণীয় সামগ্রী দর্শনে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত না নিয়ে ন্যূনতম তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা সময় চিন্তা করার অবকাশ রাখলে বাড়তি খরচের প্রবণতা বহুলাংশে কমে যায়। অনলাইন প্রযুক্তি, ছোট ভিডিও চিত্র এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো তরুণদের অপ্রয়োজনীয় বস্তু ক্রয়ে প্রলুব্ধ করে। প্রতিদিনের চা-নাস্তার ছোট ব্যয় কিংবা অনর্থক দূরত্বের যানবাহনের খরচ একত্র করলে মাসের শেষে একটি বিরাট ঘাটতি দাঁড়ায়। এই অপ্রকাশিত অপচয় রোধে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন।


আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে অপ্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে ফেলার মানসিকতাকে বলা হয় অর্থনৈতিক ঝুঁকি। যেকোনো নতুন উৎসের টাকা আসার পর বিলাসী ব্যয় বাড়ানোর বদলে অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশই ভবিষ্যতের দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা স্থায়ী সঞ্চয়ে কাজে লাগানো মঙ্গলজনক। যেকোনো শারীরিক অসুস্থতা, ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনের আকস্মিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া কিংবা আয়ের প্রাথমিক মাধ্যমটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বন্ধুদের ওপর নির্ভর না করে তিন মাসের চলার মতো একটি জরুরি নিরাপত্তা তহবিল রাখা উচিত। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র সঞ্চয় পদ্ধতির মাধ্যমে শৃঙ্খলিত তহবিল তৈরির পাশাপাশি নিজেকে আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান, ভাষা শিক্ষা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ কোর্সে নিয়োজিত করা ভবিষ্যৎ অর্থ উপার্জনের পথ বহুগুণ সম্প্রসারিত করে।
আমাদের সামাজিক পরিস্থিতিতে গতানুগতিক কাজের সংকটের মধ্যেও বর্তমান ডিজিটাল যোগাযোগের নানা সুবিধা ব্যবহার করে তরুণ সমাজ নিজেদের স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে। অনলাইনের সাহায্যে নিজস্ব মেধা কাজে লাগিয়ে ছোট পরিসরের বাণিজ্যিক উদ্যোগে আজ অনেকেই সফল। অতিরিক্ত খরচের চাহিদা মেটাতে বন্ধুদের কাছ থেকে ঘন ঘন অর্থ ধার নেওয়ার অভ্যাস মানুষের সামাজিক সম্মান হানি করে এবং ঋণের এক জঘন্য জালে আবদ্ধ করে ফেলে। সময়মতো এই আত্মসংযম বজায় রেখে পার্সোনাল ফাইন্যান্স নিয়ন্ত্রণের সঠিক শিক্ষা নিলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই একজন তরুণ নিজের পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর