ইসরায়েলি সেনার জবানবন্দিতে নাজা তথ্যচিত্র নিয়ে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিক্ষোভ ও উত্তেজনা

গাজায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত হামলা ও সামরিক অভিযানের গোপন জবানবন্দি নিয়ে নির্মিত নাজা তথ্যচিত্রটি ইসরায়েলের রাজনীতিতে তুমুল বিতর্ক ও ঝড় তুলেছে।

ইসরায়েলি সেনার জবানবন্দিতে নাজা তথ্যচিত্র নিয়ে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিক্ষোভ ও উত্তেজনা

ইসরায়েলি সেনার জবানবন্দিতে নাজা তথ্যচিত্র নিয়ে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিক্ষোভ ও উত্তেজনা


সামনে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ ও বিভাজন যখন চরমে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই গাজায় পরিচালিত সামরিক অভিযানের ভয়াবহ চিত্র নিয়ে নির্মিত একটি নতুন তথ্যচিত্র পুরো দেশের রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠাগুলোকে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভেতরের গোপন কাণ্ডকারখানা ও যুদ্ধপদ্ধতি উন্মোচনকারী এই তথ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার হওয়ার পর থেকেই দেশটির সর্বস্তরের শাসনব্যবস্থায় তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে।


'নাজা' নামের ৮০ মিনিটের এই অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রটি যৌথভাবে তৈরি করেছেন ইসরায়েলের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম এবং রাচেল জোর। সম্প্রতি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হওয়ার পর চলচ্চিত্রটি দর্শকমহলে ২৫ মিনিটের টানা করতালি পায় এবং মর্যাদাপূর্ণ 'বিশেষ জুরি পুরস্কার' লাভ করে। তথ্যচিত্রটির নাম নেওয়া হয়েছে হিব্রু সামরিক শব্দ সমষ্টি 'নেজেক আগাভি' থেকে, সামরিক পরিভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় "আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি"।


বাস্তবে এই তথ্যচিত্রে উঠে আসা কেন্দ্রীয় অভিযোগগুলোর প্রায় কোনোটিই একেবারে নতুন নয়। গাজা উপত্যকায় হামলা চালানোর সময় স্বয়ংক্রিয় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থার ব্যবহারের বিষয়টি পূর্বেও একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সেসময়ও জানা গিয়েছিল যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র একজন নির্দিষ্ট সশস্ত্র সদস্যকে শনাক্ত করার পর পুরো একটি বসতবাড়ি বা বহুতল ভবন ধ্বংস করে দেওয়া হতো, যার ফলে ভেতরে থাকা অসংখ্য সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি ঘটত। তবে এবার ঘরের ভেতরের মানুষ অর্থাৎ ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব ২৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মীর স্বকণ্ঠে দেওয়া জবানবন্দি পুরো বিষয়টিকে একেবারে নতুন এক বিস্ফোরণের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


গাজায় নির্বিচারে বেসামরিক মানুষ হত্যা, পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ তৈরি কিংবা শিশুদের ওপর হামলার বিষাদময় বাস্তবতা নিয়ে ইসরায়েলের মূলধারার সংবাদমাধ্যম কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনে এতদিন খুব একটা আলোচনা হতে দেখা যায়নি। কিন্তু 'নাজা' মুক্তি পাওয়ার পর তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া দেশটির রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশটির ডানপন্থী থেকে শুরু করে বামপন্থী বা বিরোধী দল—সব পক্ষই এখন এই চলচ্চিত্রটির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে মুখ খুলছে।


ইসরায়েলের সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহার আন্তর্জাতিক উৎসবে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও পুরস্কৃত হওয়ার পর অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলেছেন। মন্ত্রী সরাসরি দাবি জানিয়েছেন যাতে এই দুই ইসরায়েলি পরিচালকের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা হয়।


একই সুর ফুটে উঠেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কণ্ঠেও। তিনি সেনাসদস্যদের অপমান বা কটূক্তি করার অপরাধে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার নতুন কঠোর আইন পাসের জন্য আইনসভায় তোড়জোড় শুরু করেছেন। কেবল সরকারপক্ষই নয়, নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটও এই চলচ্চিত্রটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে "নৈতিক অন্ধত্ব, বাস্তবতার সাথে চরম বিচ্ছিন্নতা এবং কঠিন সময়ে রাষ্ট্রের মারাত্মক ক্ষতিসাধন" বলে অভিহিত করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট চলচ্চিত্রটিকে সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে এক "ভয়াবহ মিথ্যা রটনা" বলে আখ্যা দিয়েছেন।


সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বও এই তথ্যচিত্রকে সহজে মেনে নিচ্ছে না। সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়াল জামির সম্পূর্ণ তথ্যচিত্রটিকে মিথ্যা ও রক্তঝরার অবমাননাকর অপপ্রচার বলে বর্জন করেছেন। একই সাথে সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর কোন কোন কর্মী গোপনে এই তথ্যচিত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে ভেতরের তথ্য ফাঁস করেছেন, তাদের খুঁজে বের করতে সামরিক আইনি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। দেশটির উপকূলীয় শহর আশদোদসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মাতাদের "বিশ্বাসঘাতক" হিসেবে আখ্যায়িত করে দেয়াল লিখন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা গেছে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ইসরায়েলি সমাজের একটি বিরাট অংশ গাজার যুদ্ধকে তাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখে থাকে। সাধারণ মানুষের কাছে গাজার বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানিকে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব অপরাধের চেয়ে বরং শত্রুপক্ষের কৌশলের কারণে সৃষ্ট অনিবার্য 'আনুষঙ্গিক ক্ষতি' হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু যখন দেশেরই সেনাসদস্যরা সরাসরি ক্যামেরা বা ভয়েস চেঞ্জারের আড়ালে দাঁড়িয়ে স্বীকার করছেন যে গাজায় হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু ভুলবশত নয় বরং পরিকল্পিত নীতির অংশ ছিল, তখন দেশের মূলধারা সেই সত্যকে গ্রহণ করার বদলে নির্মাতাদের ওপর চড়াও হচ্ছে।


আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার সংগঠনগুলো যখন গাজার মানবীয় বিপর্যয় ও যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি করছে, তখন ইসরায়েলের ভেতরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের এক চরম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং নিজেদের সমর্থকদের ধরে রাখতে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা ও নির্মাতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়বে। তবে রাজনৈতিক আক্রমণ ও নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকির মুখেও এই তথ্যচিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গাজা যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রইল।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর