ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়, একের পর এক অভূতপূর্ব আচরণে তোলপাড় মার্কিন রাজনীতি

ভোটের আগে ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়, ৫ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতিসহ একের পর এক অভূতপূর্ব আচরণে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মার্কিন রাজনীতি।

ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়, একের পর এক অভূতপূর্ব আচরণে তোলপাড় মার্কিন রাজনীতি

ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়, একের পর এক অভূতপূর্ব আচরণে তোলপাড় মার্কিন রাজনীতি


যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে। ভোটারদের ৫ হাজার ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে দুর্যোগ সহায়তা নিয়ে মন্তব্য, ৯/১১ হামলার পর নিজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বিবরণ, ফেডারেল রিজার্ভের ওপর চাপ এবং কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের হোয়াইট হাউস প্রবেশাধিকার বাতিল—অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি।

সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি। তিনি বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে ৫ হাজার ডলারের ‘ডিভিডেন্ড’ দেওয়া হবে।

কিন্তু এত বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং প্রেসিডেন্ট এককভাবে এমন অর্থ বিতরণ করতে পারবেন কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২৬ কোটি প্রাপ্তবয়স্ককে ৫ হাজার ডলার করে দিতে গেলে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, এ ধরনের অর্থ বিতরণ করতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জেমি রাসকিন পরিকল্পনাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তবে ট্রাম্প নিজের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেননি।

এর মধ্যেই নর্থ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলির পক্ষে প্রচারণায় গিয়ে দুর্যোগ সহায়তা নিয়ে মন্তব্য করে নতুন বিতর্কে পড়েন ট্রাম্প। হারিকেন হেলেনে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিম নর্থ ক্যারোলিনার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হোয়াটলি হেরে গেলে তিনি অর্থ পাঠাবেন না। অবশ্য এর পরপরই ট্রাম্প জানান, তিনি কথাটি ‘মজা করে’ বলেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পাবেন।

৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তি ঘিরে ট্রাম্পের আরেকটি বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, হামলার পর গ্রাউন্ড জিরোর কাছাকাছি একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দুই দমকলকর্মী তাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছেন, তার প্রায় ১০০ কর্মী উদ্ধার ও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজে সহায়তা করেছিলেন।

তবে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ট্রাম্পের বর্ণনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর দাবি জানিয়েছেন। এমনকি সুদের হার না কমলে বাণিজ্য ঘাটতি থাকা দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সীমিত বা বন্ধ করার সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন তিনি।

এদিকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বিরোধও নতুন মাত্রা পেয়েছে। সিএনএন, এমএস নাউ ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।

নিজের প্রথম মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। নির্বাচনসংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ে আদালত প্রশাসনের প্রত্যাশা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না দেওয়ার পর প্রেসিডেন্টের অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও প্রচলিত সতর্কতার সঙ্গে দ্বিমত জানিয়েছেন ট্রাম্প। এআইয়ের বিপদ নিয়ে কিছু সতর্কতাকে তিনি ‘ধাপ্পাবাজি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের একটি অংশ শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখার পক্ষে।

কেনেডি সেন্টার ঘিরেও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রটির সঙ্গে ট্রাম্পের নাম যুক্ত করার উদ্যোগ আদালতে বাধার মুখে পড়েছে। আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এমন পরিবর্তন করা যাবে না।

এসব ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে। নির্বাচনের ফল ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী দুই বছরের আইন প্রণয়ন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্পের জনসমর্থন নিয়েও চাপের ইঙ্গিত দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপ। তবে জরিপগুলোর সময়, নমুনা ও প্রশ্নের ধরন আলাদা হওয়ায় সেগুলোকে একই সময়ের জনমতের সরাসরি পরিমাপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাই শুধু অর্থনীতি, অভিবাসন বা পররাষ্ট্রনীতি নয়—ট্রাম্পের বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বিভিন্ন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সংঘাতও জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার বড় অংশ হয়ে উঠেছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একের পর এক বিতর্কের মধ্যে ট্রাম্পের এসব বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত ভোটারদের মনোভাবে কতটা প্রভাব ফেলবে। এর উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফল এবং পরবর্তী জনমত জরিপে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর