ইরানে হিজাব পরেই যুদ্ধের প্রস্তুতি, এফপিভি ড্রোন চালাচ্ছেন নারী অপারেটররা

ইরানে হিজাব পরেই যুদ্ধের ময়দানে নারীরা, অত্যাধুনিক এফপিভি ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণ ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা ও বিতর্ক।

ইরানে হিজাব পরেই যুদ্ধের প্রস্তুতি, এফপিভি ড্রোন চালাচ্ছেন নারী অপারেটররা

ইরানে হিজাব পরেই যুদ্ধের প্রস্তুতি, এফপিভি ড্রোন চালাচ্ছেন নারী অপারেটররা


ইরানে নারী এফপিভি ড্রোন অপারেটরদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটিতে নারীদের সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং বাধ্যতামূলক হিজাব নীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছবিগুলোতে হিজাব পরা নারীদের এফপিভি বা ‘ফার্স্ট পারসন ভিউ’ ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন অনলাইন সূত্র দাবি করেছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব ছবির স্থান, সময় ও সংশ্লিষ্ট নারীদের পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। কিছু ওয়েবসাইটও ছবিগুলো প্রকাশের সময় স্পষ্ট করেছে যে সেগুলো সামাজিক মাধ্যম বা টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে নেওয়া এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

তবে ইরানে নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণে যুক্ত করার বিষয়টি শুধু সামাজিক মাধ্যমের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯ সেপ্টেম্বর তেহরানে ইরানের বড় ধরনের জনসমাবেশ ও সামরিক প্রস্তুতি প্রদর্শনের সময় সশস্ত্র নারীদের পাশাপাশি ড্রোন ও বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র প্রদর্শনের দৃশ্য প্রকাশিত হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের চলমান সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এসব দৃশ্য সামনে আসে।

ইরানের সেনাবাহিনীও সাম্প্রতিক সময়ে এফপিভি ড্রোন ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ইরানি সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, স্থলবাহিনীর বিভিন্ন অপারেশনাল ইউনিটে এফপিভি ড্রোন পরিচালনার দল গড়ে তোলা হয়েছে এবং এখন অপারেটরের সংখ্যা ও তাদের উড্ডয়ন দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সূত্রে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিপুলসংখ্যক এ ধরনের ড্রোন সংগ্রহের দাবিও করা হয়েছে। এসব সংখ্যা ইরানি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব দাবি হওয়ায় স্বাধীন যাচাই ছাড়া সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।

আরও বিস্তৃতভাবে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক প্রস্তুতি কর্মসূচিতেও নারীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের কথা পাওয়া যাচ্ছে। ইরানওয়্যারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জানফাদা’ নামে একটি কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছাসেবীদের ক্ষুদ্র ড্রোন পরিচালনাসহ আধুনিক যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল শেখানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই কর্মসূচির কাঠামোর মধ্যে নারীদের জন্য বিশেষ ইউনিট ও সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই নারী ড্রোন অপারেটরদের ছবি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। ‘Oliver’ নামে উল্লেখ করা একটি পোস্টে মূল বক্তব্য ছিল—ইরানি নারীরা অস্ত্রবাহী ড্রোন পরিচালনা করতে পারেন, কিন্তু তাদের চুল দেখা যাওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিধিনিষেধ রয়েছে। মন্তব্যটি কোনো সরকারি বক্তব্য নয়; এটি ইরানের সামরিক নীতি ও নারীদের পোশাকসংক্রান্ত আইনের বৈপরীত্য তুলে ধরতে লেখা রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যঙ্গ।

ইরানে নারীদের জন্য হিজাবের আইনি বাধ্যবাধকতা এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক হিজাবসংক্রান্ত আইন ও নীতি বহাল রেখেছে। তবে আরও কঠোর শাস্তির বিধানসংবলিত ‘হিজাব অ্যান্ড চ্যাস্টিটি’ আইনটির বাস্তবায়ন স্থগিত রয়েছে।

বাস্তব পরিস্থিতি অবশ্য আইনের ভাষার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকায় বহু নারী এখন প্রকাশ্যেই মাথায় ওড়না বা হিজাব ছাড়াই চলাফেরা করছেন। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের পর হিজাব আইন প্রয়োগে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যে সরকার আগের মতো ব্যাপকভাবে হিজাববিধি প্রয়োগ করছে না বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, বড় শহরগুলোতে একসময় নিয়মিত দেখা যাওয়া হিজাব তদারককারী টহল অনেকটাই কমে গেছে এবং বহু নারী প্রকাশ্যে মাথা না ঢেকেই চলাচল করছেন। কিন্তু বাধ্যতামূলক হিজাবের আইনি কাঠামো এখনো বহাল থাকায় এই পরিবর্তনকে আইন বাতিল হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে দেশটির রক্ষণশীল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অংশ হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকরের দাবি অব্যাহত রেখেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও বিভিন্ন শহরে হিজাব না মানলে বিচারিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যানার দেখা গেছে বলে ইরানওয়্যার জানিয়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও হিজাববিধি নিয়ে নতুন নির্দেশনা তৈরির খবর এসেছে।

ফলে নারী এফপিভি ড্রোন অপারেটরদের ছবি ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনার পেছনে দুটি সমান্তরাল বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে ইরান আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট ও তুলনামূলক সস্তা এফপিভি ড্রোনের ব্যবহার বাড়াতে অপারেটর প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করছে এবং নারীদেরও কিছু সামরিক ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করছে। অন্যদিকে নারীদের পোশাক ও হিজাব নিয়ে কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ আইনগতভাবে এখনো বহাল।

এই দুই বাস্তবতার বৈপরীত্যই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যঙ্গটির মূল বিষয়। তবে ‘নারীরা অস্ত্রবাহী ড্রোন চালাতে পারেন কিন্তু চুল দেখাতে পারেন না’—এটি ইরান সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক নীতিবিবৃতি নয়। বরং সামরিক প্রশিক্ষণে নারীর অংশগ্রহণ এবং বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের পাশাপাশি অবস্থানকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর