গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর

রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন।

গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর

গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর


উত্তর মেরু ও সুমেরু অঞ্চলের কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এসেছে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বরফাবৃত স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছাল ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড সরকার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আগামী সপ্তাহের সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।


দীর্ঘদিন ধরে আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য বিস্তার ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার লক্ষ্যে গ্রিনল্যান্ডের ওপর নজর দিয়ে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই গ্রিনল্যান্ডকে ক্রয় করার অথবা এর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তবে ডেনমার্কের তীব্র আপত্তি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের মুখে সেই প্রচেষ্টা সফল না হলেও, নতুন এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান নিরাপত্তা লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
নতুন চুক্তির ধারা অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ীভাবে যাতায়াত, বিমান উড্ডয়ন এবং সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা ও সম্প্রসারণের অধিকার লাভ করবে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পিতুফিক মহাকাশ ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ও কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। চুক্তিটির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, উত্তর মেরু অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে পরিচিত চীন এবং রাশিয়াকে গ্রিনল্যান্ডে কোনো ধরনের সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ, সৈন্য মোতায়েন কিংবা সংবেদনশীল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে সুমেরু অঞ্চলে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব সম্পূর্ণ প্রতিহত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতির সুবিধা দেওয়া হলেও ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের সার্বভৌমত্বে কোনো আঘাত হানতে দেওয়া হয়নি। ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করেছিলেন যে ওয়াশিংটন গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার ওপর স্থায়ী ও চিরস্থায়ী কর্তৃত্ব পেয়েছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই প্রতিক্রিয়া জানায় কোপেনহেগেন ও নুক প্রশাসন।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকে রাসমুসেন স্পষ্ট বক্তব্যে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত এই সমঝোতা ডেনমার্কের নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তা এবং নীতিমালার লাল সীমানা অতিক্রম করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হলো এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হলো। এটি ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র—সব পক্ষের জন্যই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।


একই সুর ফুটে উঠেছে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনের কথায়। তিনি মন্তব্য করেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করার জন্য নয় এবং দেশের ভূখণ্ড কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার কোনো অবস্থাতেই হাতছাড়া করা হয়নি। চুক্তিটিতে স্পষ্টভাবে গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের বিষয়টি পুনরুল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এই নিরাপত্তার মাধ্যমে দ্বীপটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।


বিশ্লেষকদের মতে, বরফ গলতে শুরু করায় আর্কটিক অঞ্চলের নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। রাশিয়া ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছিল এবং চীনও আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের অর্থনৈতিক কৌশল জোরদার করছিল। এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের এই যৌথ সামরিক কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতির মানচিত্রে এক বিরাট পরিবর্তন আনবে।
ডেনমার্কের স্থানীয় সংসদে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকর হবে এই বহুল আলোচিত নিরাপত্তা চুক্তি। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর