কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ওয়েসলি শেরম্যানটাইনের ৬০০ বছরের কারাদণ্ড চলাকালে কারাগারে মৃত্যু

কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ওয়েসলি শেরম্যানটাইনের ৬০ বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছে।

কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ওয়েসলি শেরম্যানটাইনের ৬০০ বছরের কারাদণ্ড চলাকালে কারাগারে মৃত্যু

কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ওয়েসলি শেরম্যানটাইনের ৬০০ বছরের কারাদণ্ড চলাকালে কারাগারে মৃত্যু


যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ও কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার 'স্পিড ফ্রিক কিলারস' দলের সদস্য ওয়েসলি শেরম্যানটাইন কারাগারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অব কারেকশনস অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন থেকে দেয়া এক সরকারি বিবৃতিতে তার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট প্রিজন স্যাক্রামেন্টোর সেন্ট্রাল হেলথ সেন্টারে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট বা প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। স্যাক্রামেন্টো কাউন্টি ময়নাতদন্তকারীর কার্যালয় থেকে বিস্তারিত পরীক্ষার পর তার মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।


ওয়েসলি শেরম্যানটাইন তার শৈশবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু লরেন হার্জোগের সাথে মিলে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান জোয়াকিন কাউন্টি ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এক চরম ভীতিকর তাণ্ডব চালিয়েছিল। তারা দুজনই অতিরিক্ত মাত্রায় মেথঅ্যামফিটামিন নামক ভয়াবহ মাদকের নেশায় আসক্ত ছিল। ক্রমাগত ও অনিয়ন্ত্রিত মাদক সেবনের ফলে সৃষ্টি হওয়া তীব্র উন্মাদনা ও হ্যালুসিনেশন থেকে তারা একের পর এক নির্দোষ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করে। মাদকের এই তীব্র প্রভাব এবং অবিশ্বাস্য দ্রুতিতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ভয়াবহ পদ্ধতির কারণে মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম তাদের যৌথভাবে 'স্পিড ফ্রিক কিলারস' ছদ্মনাম দেয়। দীর্ঘ প্রায় পনেরো বছর ধরে সান জোয়াকিন কাউন্টির প্রত্যন্ত এলাকা, বনাঞ্চল এবং গ্রামীণ পথগুলোতে তারা একের পর এক অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।


১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে ক্যালিফোর্নিয়া পুলিশের টানা ও দীর্ঘ তদন্তের পর অবশেষে তারা দুজনে গ্রেফতার হয়। তাদের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের রক্তক্ষয়ী ও ভীতিকর হত্যাকাণ্ডের সমাপ্তি ঘটে। তদন্তকারী দল শেরম্যানটাইনের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে নিহত এক ভুক্তভোগীর রক্তের নমুনা ও অন্যান্য বায়োলজিক্যাল আলামত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যা মামলায় তাদের অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং নিষ্পত্তিমূলক শক্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। আদালত ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে চারজন মানুষকে হত্যার অভিযোগে শেরম্যানটাইনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। নিহত সেই চারজন ভুক্তভোগী হলেন সিন্ডি ভ্যান্ডারহাইডেন, চেভেল শেভি হুইলার, হাওয়ার্ড কিং এবং পল কাভানফ। সান্তা ক্লারা কাউন্টির আদালত ২০০১ সালে শেরম্যানটাইনের বিচারে তাকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে ফাঁসির কাষ্ঠে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
তবে আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র চারটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে পারলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর দৃঢ় বিশ্বাস যে, শেরম্যানটাইন এবং লরেন হার্জোগের হাতে সত্তর জনেরও বেশি মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের শিকার হওয়া অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন তরুণী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী। ১৯৯৯ সালে গ্রেফতারের পর থেকে তারা দুজনই নিহত ব্যক্তিদের লাশ কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে সে সম্পর্কিত তথ্য গোপন করে রেখেছিল। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা নিরবতা পালন করে এবং কোনো মৃতদেহের অবস্থান জানাতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ঘটনার মোড় ঘোরে ২০১২ সালে, যখন একজন নামকরা বাউন্টি হান্টার ও গোয়েন্দা লিওনার্ড প্যাডিলা কারাগারে শেরম্যানটাইনের সাথে বিশেষ সমঝোতা করেন। তিনি শেরম্যানটাইনকে ত্রিশ হাজার মার্কিন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যেন শেরম্যানটাইন নিহতদের গোপন গণকবর ও মৃতদেহ পুঁতে রাখার মানচিত্র একে দেয়। অর্থের বিনিময়ে রাজি হয়ে শেরম্যানটাইন হাতে আঁকা বেশ কয়েকটি মানচিত্র তৈরি করে দেয়, যেখানে তাদের পুঁতে রাখা বিভিন্ন লাশের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করা ছিল। সেই নির্দেশক মানচিত্র ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার লিন্ডেন এলাকার একটি পরিত্যক্ত গবাদি পশুর খামারের পুরোনো গভীর কুয়োয় এবং ক্যালাভেরাস কাউন্টির নির্জন পার্বত্য অঞ্চলে বিশাল পরিসরে খননকার্য পরিচালনা করা হয়।
সেই ভয়াবহ খননকালে তদন্তকারীরা কুয়োর গভীর থেকে এক হাজারের বেশি মানুষের হাড়ের টুকরো, ব্যবহৃত জামাকাপড়, নারীদের পার্স, গয়না এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী উদ্ধার করেন। ডিএনএ পরীক্ষা ও দন্ত পরিচয়ের ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সাল থেকে নিখোঁজ থাকা ১৯ বছর বয়সী কিম্বার্লি বিলি এবং ১৬ বছর বয়সী জোআন হবসন নামের দুই কিশোরীর অবশিষ্টাংশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এই আবিষ্কার পুরো মার্কিন মুলুকে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, শেরম্যানটাইনের সহযোগী লরেন হার্জোগের আইনি জটিলতার কারণে সাজা কিছুটা ভিন্ন রূপ নিয়েছিল। ২০০১ সালে তাকেও একাধিক হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত করে ৭৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলেও, ২০০৪ সালে আপিল আদালত সেই রায় বাতিল ঘোষণা করে। আদালত পর্যবেক্ষণ জানায় যে, পুলিশ জোরপূর্বক ও অবৈধ মানসিক চাপ প্রয়োগ করে হার্জোগের স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল। ফলে আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে সে সমঝোতামূলক অপরাধ স্বীকারের মাধ্যমে সাজার মেয়াদ কমিয়ে আনে এবং ২০১০ সালে প্যারোলে মুক্ত হয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। তবে তার স্বাধীনতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বাউন্টি হান্টার প্যাডিলা তাকে ফোন করে জানান যে শেরম্যানটাইন পুলিশের কাছে গোপন গণকবরের মানচিত্র ও সমস্ত তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছে। ফোন পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চরম আতঙ্কে ৪৬ বছর বয়সী লরেন হার্জোগ ট্রেলারের ভেতরে আত্মহত্যা করে নিজেকে শেষ করে দেয়।
শেরম্যানটাইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা ২৫ বছর ক্যালিফোর্নিয়ার অত্যন্ত সুরক্ষিত সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বন্দী জীবন যাপন করছিল। যদিও ২০০৬ সালের পর থেকে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি এবং ২০১৯ সালে গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছিলেন, তবুও তার মৃত্যুদণ্ডের আইনি স্থিতি বহাল ছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সান জোয়াকিন কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি রন ফ্রেইটাস এক আবেগঘন বিবৃতিতে বলেন যে, কিলার শেরম্যানটাইনের এই মৃত্যুতে নিহতদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের অপূরণীয় ক্ষতি বা বেদনা মুছে যাবে না। তবে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মার্কিন অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম একটি বিভীষিকাময় ও অন্ধকার অধ্যায়ের চিরতরে সমাপ্তি ঘটল।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর