ইরান যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে ছয় উপসাগরীয় দেশের মতামত নেবেন ট্রাম্প; কূটনীতি নাকি নতুন সামরিক অভিযান সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিশ্ব।

ইরান যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

ইরান যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের মুখে রয়েছেন। এরই মধ্যে আগামী মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের নেতা বা শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। বৈঠকটি মূলত ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, সম্ভাব্য যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে হতে পারে। 

অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি উপসাগরীয় মিত্রদের কাছ থেকে সরাসরি জানতে চান পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবস্থান কী। তাঁর ভাষায়, “আমি জানতে চাই তারা কোথায় আছে এবং কেমন আছে। আমরা তাদের খুব সুরক্ষা দিয়ে আসছি।” উদ্ধৃতিটি অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও একই বক্তব্য প্রকাশ করেছে। 

মূল দাবিটির ভিত্তি সঠিক। অ্যাক্সিওস ১৭ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, ট্রাম্প আগামী মঙ্গলবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখনও পর্যন্ত সব ছয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশগুলোর নেতা অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বৈঠকে থাকতে পারেন। 

এই বৈঠকের গুরুত্ব বেড়েছে কারণ ইরান যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর অগ্রগতি এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। 

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিটিও সরাসরি। সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ছয় দেশই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসির সদস্য। এদের কয়েকটিতে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব দেশের নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক নৌপথ ঝুঁকির মুখে পড়ে। 

ট্রাম্পের বক্তব্যে কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিতও রয়েছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, তিনি আশা করছেন যুদ্ধের শেষের দিকে এগোনো যাচ্ছে এবং ইরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ঘোষণা হয়নি। রয়টার্স জানিয়েছে, জুনে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা আর এগোয়নি। 

অন্যদিকে, ট্রাম্প সামরিক বিকল্পও খোলা রেখেছেন। অ্যাক্সিওসের সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না, সেটি নিয়ে তিনি সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছেন। তাঁর মন্তব্যের অর্থ দাঁড়ায় ওয়াশিংটন একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধান এবং সামরিক চাপ দুই পথই বিবেচনায় রাখছে। 

এখানেই উপসাগরীয় বৈঠকটির কৌশলগত গুরুত্ব। ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধ-পরবর্তী একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করছে বলে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে। পরিকল্পনাটিতে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন এবং ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও ভাবনা থাকতে পারে। তবে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে চূড়ান্ত হয়নি। 

উপসাগরীয় দেশগুলোর মতামত নেওয়ার আরেকটি কারণ হলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০৩ ডলারে ছিল, যদিও সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করায় বাজারের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। 

একই সময়ে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় সৌদি আরবও চাপের মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ইয়েমেনের ভেতরে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়েছে। হুথিদের লোহিত সাগরের উপকূলে অগ্রগতি বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। 

রয়টার্সের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এবং সৌদি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত সমস্যাও তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন একদিকে উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের মধ্যে নতুন সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এড়াতে চাইছে। 

আগামী মঙ্গলবারের বৈঠক তাই শুধু একটি নিয়মিত কূটনৈতিক বৈঠক নয়। এটি হতে পারে ইরান যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ট্রাম্প যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ জোরদার হতে পারে। বিপরীতে, যদি সামরিক বিকল্পকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনও এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে যখন ইরান যুদ্ধ, ইয়েমেন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। ফলে নিউইয়র্কে ট্রাম্পের বৈঠক থেকে আসা যেকোনো বার্তা শুধু ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর