সৌদির অনুরোধে ইরানকে হুতিদের থামাতে বলেছে চীন, বাড়ছে লোহিত সাগর সংকট নতুন করে
সৌদির অনুরোধে চীন ইরানকে হুতিদের সংযত করতে বলেছে, যখন বাব এল-মান্দাব ঘিরে সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি ও নৌবাণিজ্যে ঝুঁকি তৈরি করছে।
সৌদির অনুরোধে ইরানকে হুতিদের থামাতে বলেছে চীন, বাড়ছে লোহিত সাগর সংকট নতুন করে
সৌদি আরবের অনুরোধের পর ইয়েমেনের হুতি বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানের ওপর প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছে চীন। রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে তিনজন ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চাওয়ার পর চীন ব্যক্তিগতভাবে তেহরানকে হুতিদের সামরিক তৎপরতা কমাতে এবং নতুন করে সংঘাত না বাড়ানোর জন্য প্রভাব ব্যবহার করতে বলেছে।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত সামরিক অগ্রগতি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা বাব এল-মান্দাব প্রণালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড দখল করেছে। এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এবং এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর উদ্বেগ বেড়েছে।
বাব এল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য এবং জ্বালানি পরিবহনে এই জলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেইজিংয়ের এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। চীন ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা এবং তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। এই সম্পর্কের কারণে ইরানের ওপর চীনের একটি বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তবে সেই প্রভাব ব্যবহার করে হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ড কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চীনের এই পদক্ষেপ প্রকাশ্যে আসার আগে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও সামরিক সহায়তা চেয়েছিল। রয়টার্সের ১১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি। সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
এর পর সৌদি আরব চীনের দ্বারস্থ হওয়াকে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখানে ‘চীন সৌদির পক্ষে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করছে’—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং চীনের উদ্যোগটি কূটনৈতিক এবং এর লক্ষ্য ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে হুতিদের কর্মকাণ্ড কমানোর চেষ্টা করা।
চীনের পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের দিকে ঝুঁকে থাকে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রেও চীন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা আসে। বর্তমান সংকটে সৌদি আরবের চীনের কাছে যাওয়ার পেছনে সেই পূর্ববর্তী কূটনৈতিক সম্পর্কও একটি কারণ হতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি ২০২৩ সালের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। কারণ এবার শুধু সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইয়েমেনের যুদ্ধ, হুতি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা, লোহিত সাগরের নৌপথ, বাব এল-মান্দাব এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির ফলে সৌদি আরব বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান তৈরি করেছে। একই সময়ে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং হুতিরাও সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংঘাতের ফলে বাব এল-মান্দাবের পাশাপাশি লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বাব এল-মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় কমেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
হরমুজ প্রণালি এবং বাব এল-মান্দাব—দুটি আলাদা জলপথ হলেও বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তাদের গুরুত্ব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। অন্যদিকে বাব এল-মান্দাব লোহিত সাগরের প্রবেশপথ হিসেবে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাণিজ্যিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দুটি জলপথেই যদি দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে জ্বালানি পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হলে পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
চীনের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে লোহিত সাগর বা বাব এল-মান্দাবের নিরাপত্তা সংকট দীর্ঘায়িত হলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক পরিবহনেও প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণেই বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইরানের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের অনুরোধের জবাবে তেহরান এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি, যাতে বোঝা যায় তারা হুতিদের সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছে। বরং ইরানের বক্তব্যে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের বিষয়টি সামনে এসেছে।
অর্থাৎ চীন ইরানকে বার্তা দিলেও তেহরান সেই বার্তা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত। একইভাবে হুতি বাহিনী ইরানের নির্দেশনা কতটা অনুসরণ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। হুতিরা নিজেদের ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেও যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশ তাদের ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ইরান হুতিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যদিও তেহরান বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগের বিভিন্ন অংশ অস্বীকার করেছে।
বর্তমান সংঘাতে হুতিদের দ্রুত অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং অতীতে হুতি হামলায় সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের অগ্রগতির পর সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের হুমকিও সামনে এসেছে। এতে সৌদি আরবের লোহিত সাগরভিত্তিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্তও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব ছিল। তবে সৌদি আরব যে ধরনের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়েছিল, সেটি যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করেনি।
এই অবস্থায় সৌদি আরবের জন্য কূটনৈতিক পথ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য একটি মাধ্যম হিসেবে সামনে এসেছে। তবে চীনের উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ইরান কতটা সহযোগিতা করে এবং ইরান-সমর্থিত হুতিরা তাদের সামরিক অভিযান কতটা পরিবর্তন করে তার ওপর।
এখন পর্যন্ত চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়া উচিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম ও আলোচনার পথে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সৌদি আরবের অনুরোধের পর তেহরানের কাছে ব্যক্তিগতভাবে হুতিদের সংযত করার আহ্বান জানানোর বিষয়টি চীনের উদ্বেগের মাত্রা প্রকাশ করছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।