ইরানের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের দাবি ট্রাম্পের, কূটনীতির পথে ফিরছে কি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক?

ট্রাম্প সরাসরি যোগাযোগের দাবি করলেও তেহরান আলোচনা নিশ্চিত করেনি; মধ্যস্থতা, শর্ত, যুদ্ধ ও হরমুজ সংকটের মাঝে কূটনীতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের দাবি ট্রাম্পের, কূটনীতির পথে ফিরছে কি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক?

ইরানের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথনের দাবি ট্রাম্পের, কূটনীতির পথে ফিরছে কি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক?


মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পক্ষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে এবং তেহরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ হয়তো শেষ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে—সত্যিই কি কূটনীতি নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে, নাকি এটি যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বিনিময়ের আরেকটি ধাপ?

আল জাজিরার ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জানান, তিনি ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কথা শুনেছেন এবং তাঁর ভাষায় ইরান একটি চুক্তি করতে চায়। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শেষ করার জন্য আলোচনার সম্ভাবনা তিনি বিবেচনা করছেন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত যুদ্ধের শেষের দিকে পৌঁছেছে।

তবে এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কতা। ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগের দাবি এবং ইরানের প্রকাশ্য অবস্থানের মধ্যে এখনো পার্থক্য রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই ট্রাম্পের বক্তব্যকে পরস্পরবিরোধী বার্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনার বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ ওয়াশিংটন থেকে আলোচনার সম্ভাবনার বার্তা এলেও তেহরানের পক্ষ থেকে এখনো একই মাত্রার প্রকাশ্য সম্মতি পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কাতার, পাকিস্তান ও ওমান বিভিন্ন পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রেখেছে। ফলে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগের দাবি সত্য হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনো নেই। আল জাজিরার প্রতিবেদনে সাবেক ইরানি কূটনীতিক আব্বাস খামেয়ারও বলেছেন, সাম্প্রতিক যোগাযোগকে নতুন কোনো আলোচনার পরিবর্তে আগে থেকে চলা কাঠামোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি চীনে অবস্থানকালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। দুই পক্ষ আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এর আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংযম দেখানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দ্রুত পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে নয়। আরাকচি জানিয়েছেন, আঞ্চলিক শান্তি ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেও তেহরান আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে। এর অর্থ হলো, যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যেই নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোকেও আলোচনার অংশ করা হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্স জানিয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কে ট্রাম্পের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর নেতাদের বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। আলোচনায় যুদ্ধ-পরবর্তী কৌশল এবং সংঘাতের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে বিষয় থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কূটনীতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও মাঠের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘাত তীব্র হয়েছে। এই সংঘাতে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য উল্লেখ করেছে রয়টার্স। সংঘাতের বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হরমুজ প্রণালিও সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান প্রণালিটি বন্ধ রাখার অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত সেটি খোলার বিষয়ে অনড় রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। রয়টার্সের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের খুচরা গড় দামও নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কেবল সামরিক বা কূটনৈতিক সংকট নয়, এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ওমানের উদ্যোগে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও সেটি স্থগিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন আলোচনায় যাওয়ার প্রশ্ন নেই।

এই অবস্থায় ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যকে সরাসরি শান্তিচুক্তির ঘোষণা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং এটি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার একটি ইঙ্গিত। কারণ যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে শুধু দুই দেশের নেতাদের যোগাযোগ যথেষ্ট নয়; যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামোর মতো একাধিক জটিল বিষয় নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন হবে।

বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয়। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করাকে যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ইরান বলে আসছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুই পক্ষের মধ্যে আগে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও সেগুলো স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছায়নি। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেটি ভেঙে পড়ে। এরপর নতুন করে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এগোয়নি। তাই এবার ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগের দাবি বাস্তব আলোচনায় রূপ নেয় কি না, সেটিই নজর রাখার বিষয়।

বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই ‘কূটনীতি পুরোপুরি ফিরে এসেছে’—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং বলা যায়, কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা আবার সামনে এসেছে, কিন্তু তা এখনো অনিশ্চিত ও শর্তনির্ভর। একদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন এবং ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের দাবি করছেন; অন্যদিকে তেহরান প্রকাশ্যে নিজেদের শর্তের ওপর জোর দিচ্ছে এবং সরাসরি নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

আগামী কয়েক দিন তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হয় কি না, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কোনো নতুন কাঠামো তৈরি হয় কি না, হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে সমঝোতা হয় কি না এবং ইয়েমেনের সংঘাত কমে কি না—এসব বিষয়ের ওপরই কূটনৈতিক উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি অনেকটা নির্ভর করবে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে নিশ্চিত তথ্য হলো, ট্রাম্প সরাসরি যোগাযোগের দাবি করেছেন এবং যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনার কথা বলেছেন; কিন্তু তেহরানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়া এটিকে পূর্ণাঙ্গ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা করার পর্যায়ে এখনো নেওয়া যায় না। ফলে কূটনীতির দরজা হয়তো আবার খুলছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে দুই পক্ষ সত্যিই চুক্তির পথে এগোয় কি না—তার উত্তর এখনো সময়ের অপেক্ষায়।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর