ভিয়েতনামের উত্তরে ভয়াবহ বন্যা, ডুবে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি, বাড়ছে মানবিক সংকট

ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা, দুই হাজারের বেশি বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে, বিচ্ছিন্ন বহু পরিবার, বাড়ছে দুর্ভোগ।

ভিয়েতনামের উত্তরে ভয়াবহ বন্যা, ডুবে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি, বাড়ছে মানবিক সংকট

ভিয়েতনামের উত্তরে ভয়াবহ বন্যা, ডুবে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি, বাড়ছে মানবিক সংকট


প্রবল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। দেশটির নিন বিন, থানহ হোয়া ও নে আনসহ কয়েকটি প্রদেশে হাজারো বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাজধানী হ্যানয়ের বিভিন্ন এলাকাতেও পানি ঢুকে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন সেনাসদস্য ও উদ্ধারকর্মীদের মাঠে নামিয়েছে। 

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর ভিয়েতনামের বন্যায় দুই হাজারের বেশি বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে এবং এক হাজারের বেশি পরিবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি কৃষিজমিতেও ঢুকে পড়েছে, ফলে ফসল ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। 

বন্যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নিন বিন, থানহ হোয়া ও নে আন প্রদেশে। কয়েক দিন ধরে চলা ভারী বৃষ্টির কারণে নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকে। কোথাও কোথাও নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে চলে যাওয়ায় নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা জারি করে মানুষকে নদী ও জলাবদ্ধ অঞ্চল থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। 

হ্যানয় শহরেও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর কিছু এলাকায় প্রায় এক মিটার পর্যন্ত পানি জমেছে। রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অনেক মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারেননি এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ অথবা অনলাইনে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নগরীর নিচু এলাকাগুলোতে পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। 

শহরের বাইরে পরিস্থিতি আরও কঠিন। বন্যার পানিতে অনেক গ্রামীণ রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় দুর্গত মানুষের কাছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের নৌকা ব্যবহার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বহু পরিবার সাময়িকভাবে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা উঁচু এলাকায় অবস্থান করছে।

বন্যায় কৃষিখাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এপি জানিয়েছে, প্রায় ১০ হাজার ১৪ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু মারা গেছে অথবা বন্যার কারণে সরিয়ে নিতে হয়েছে। কৃষকদের জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে, কারণ উত্তর ভিয়েতনামের বহু পরিবার কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। 

বন্যার পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকলে কৃষিজমির মাটি ও ফসলের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ধান ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ক্ষতি হলে গ্রামীণ পরিবারের আয় কমে যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকদের সামনে আবার জমি প্রস্তুত করা, বীজ সংগ্রহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামার পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

উদ্ধারকাজে ভিয়েতনামের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরা কাজ করছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক মানুষ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বন্যার কারণে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ বা সীমিত হয়েছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোকেও বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও সড়কের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ, কারণ প্রবল স্রোতে কোনো কোনো জায়গায় রাস্তার অংশ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় আঞ্চলিক জল-আবহাওয়া কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে উত্তরাঞ্চলের পাশাপাশি ভিয়েতনামের আরও কিছু এলাকায় বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। হো চি মিন সিটিসহ দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকাতেও অতিরিক্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়েছে। 

এ কারণে বন্যা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার পরিবর্তে আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলেও নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে আবার পানি বেড়ে যেতে পারে। ফলে স্থানীয় প্রশাসনকে একদিকে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর পাশাপাশি অন্যদিকে নতুন করে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখতে হচ্ছে।

ভিয়েতনামের জন্য এবারের বন্যা আরও একটি বড় দুর্যোগের স্মৃতি সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। গত কয়েক বছরেও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের বন্যা ও ঝড় হয়েছে। এসব দুর্যোগে কৃষি, অবকাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে বেশি জলীয়বাষ্প জমা হওয়ায় কোনো কোনো অঞ্চলে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো বন্যাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বর্তমান বন্যার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে প্রবল বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এসেছে। 

হ্যানয়ে বন্যার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনেও পড়েছে। রাস্তা পানিতে ডুবে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষকে কোমরসমান পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটের কিছু অংশ বন্ধ রাখতে হয়েছে। নিচু এলাকার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষ মূল্যবান জিনিসপত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য কিছু বিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ করা হয়েছে বা অনলাইনে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিশুদের নিরাপদে ঘরে রাখার পাশাপাশি যেসব এলাকায় পানি দ্রুত বাড়ছে, সেখানে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

বন্যার পর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় নোংরা পানিতে থাকার কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই দুর্গত এলাকায় নিরাপদ খাবার পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উদ্ধারকর্মীদের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়। প্রবল স্রোত, জলাবদ্ধ সড়ক এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সেনাসদস্যরা নৌকা ও অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও নিজেদের নৌকা ব্যবহার করে প্রতিবেশীদের উদ্ধারে সহযোগিতা করছেন। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিতে ভিয়েতনামের বর্তমান বন্যার গুরুত্ব শুধু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণে নয়; বরং এটি জলবায়ু ঝুঁকি, নগর ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। হ্যানয়ের মতো দ্রুত বাড়তে থাকা নগরীতে ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় নদী ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেশি।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর