ট্রাম্পের চাপের মাঝে কানাডাকে ইইউর সহযোগী করার প্রস্তাব
ট্রাম্পের শুল্কচাপের মধ্যেই কানাডাকে ইইউর প্রথম সহযোগী সদস্য করার প্রস্তাব দিলেন উরসুলা ভন ডার লিয়েন।
ট্রাম্পের চাপের মাঝে কানাডাকে ইইউর সহযোগী করার প্রস্তাব
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পথে এগোচ্ছে কানাডা। এরই মধ্যে কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার সম্ভাবনার কথা সামনে এনেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। প্রস্তাবটি এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
১৬ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ ভাষণে ভন ডার লিয়েন সরাসরি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে উদ্দেশ করে এই প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, কানাডাকে ইইউর প্রথম সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দরজা খুলতে তিনি কার্নির সঙ্গে কাজ করতে চান। তাঁর এই বক্তব্যের পর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কানাডা এখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয়ে যাচ্ছে। ‘সহযোগী সদস্য’ নামে কোনো আনুষ্ঠানিক মর্যাদা বর্তমানে ইইউর প্রচলিত কাঠামোয় নেই। ফলে ভন ডার লিয়েনের বক্তব্যকে আপাতত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রস্তাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে দুই পক্ষকে এর সুনির্দিষ্ট কাঠামো, অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অবশ্য এরই মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে ‘সেটা’ নামে পরিচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর রয়েছে। এবার সেই বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর ‘অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার’ বা ‘ভবিষ্যতের জোট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ভন ডার লিয়েন।
নতুন এই অংশীদারত্বের সম্ভাব্য ক্ষেত্রও বেশ বিস্তৃত। আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, আর্কটিক অঞ্চল, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাত এতে গুরুত্ব পেতে পারে। এর মাধ্যমে দুই পক্ষ নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেতে পারে।
কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভন ডার লিয়েন বলেন, ইউরোপ ও কানাডা গণতন্ত্রের ওপর বিশ্বাস করে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ ও অংশীদার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রস্তাবিত অংশীদারত্ব কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং ইউরোপ ও কানাডার সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে দেশটির বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত বাণিজ্যনির্ভরতা কমাতে কানাডা ইউরোপসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও নতুন শিল্পখাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সাম্প্রতিক উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার মন্তব্য অটোয়ার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। কানাডা এর জবাবে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
জানুয়ারিতে ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক ভাষণেও কার্নি বিশ্বের মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে এককভাবে আলোচনা করলে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান তৈরি হতে পারে। তাই কানাডা এখন একাধিক শক্তিশালী অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।
ইউরোপের দিক থেকেও কানাডার গুরুত্ব কম নয়। বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং আর্কটিক অঞ্চলে কানাডার অবস্থান ইউরোপের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে ইউরোপও প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। ফলে দুই পক্ষের স্বার্থের বেশ কিছু জায়গায় মিল তৈরি হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবে কতদূর এগোয়, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ ‘সহযোগী সদস্য’ হিসেবে কানাডার সম্ভাব্য অবস্থান কী হবে, ইইউর সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেশটির কোনো ভূমিকা থাকবে কি না এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কাঠামো কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে ভন ডার লিয়েনের প্রস্তাবকে কানাডার ইইউ সদস্যপদের ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং দুই পক্ষের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার একটি বড় রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতার মধ্যে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠতা এখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতগুলোর একটি। সামনে এই প্রস্তাব কীভাবে এগোয় এবং ইইউর সদস্য দেশগুলো এর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।