যুক্তরাষ্ট্রে আবারও সুদের হার বাড়াল ফেড, ঋণ ও খরচে বাড়তে পারে চাপ
মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়াল ফেড, বাড়তে পারে ঋণ, বাড়ির কিস্তি ও ক্রেডিট কার্ডের খরচ।
যুক্তরাষ্ট্রে আবারও সুদের হার বাড়াল ফেড, ঋণ ও খরচে বাড়তে পারে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় আবারও সুদের হার বাড়িয়েছে। ফেডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় তহবিলের সুদের লক্ষ্যমাত্রা শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের পর এটিই প্রথম সুদের হার বৃদ্ধি।
ফেডের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হার বাড়লে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের খরচ বাড়ার চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড, গাড়ির ঋণ, ব্যবসায়িক ঋণ এবং নতুন বাড়ির বন্ধকী ঋণের ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ঋণগ্রহীতাদের খরচ বাড়তে পারে, যদিও সঞ্চয়কারীরা আমানত ও সঞ্চয়পত্রে কিছুটা বেশি রিটার্ন পেতে পারেন।
ফেড জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি এখনো তাদের ২ শতাংশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ওপরে রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কার্যক্রমও শক্তিশালী রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্যও ফেডের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রি ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ে খুচরা বিক্রি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছিল। আগস্টের এই বৃদ্ধি অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল।
আগস্টের শক্তিশালী খুচরা বিক্রির অর্থ হলো, মূল্য বাড়ার পরও অনেক আমেরিকান ভোক্তা কেনাকাটা চালিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ি, রেস্তোরাঁ, অনলাইন কেনাকাটা এবং স্কুল শুরুর মৌসুমের কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। গ্যাস স্টেশন বাদ দিয়েও খুচরা বিক্রি ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে বলে এপি জানিয়েছে।
তবে এই শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয়ের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও অব্যাহত রয়েছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি মূল্য শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ শতাংশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি ২০২২ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।
ফেডের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চলতি বছর আরও একটি সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফেডের নীতিনির্ধারকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ হওয়ার আগে আরও একটি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক তথ্যের ওপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
ফেডের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কিছুটা বেশি ধরা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ফেডের নতুন পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৩ শতাংশ রাখা হয়েছে।
সুদের হার বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব প্রথমে দেখা যেতে পারে পরিবর্তনশীল সুদের ঋণে। বিশেষ করে যেসব মানুষ ক্রেডিট কার্ডের পুরো বিল প্রতি মাসে পরিশোধ করেন না, তাদের বকেয়া ঋণের সুদের খরচ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গাড়ি কেনার জন্য যারা নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ঋণের সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ। সুদের হার সামান্য বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি ঋণে মাসিক কিস্তি ও মোট পরিশোধের পরিমাণ বাড়তে পারে।
বাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। ফেডের নীতিগত সুদের হার এবং ৩০ বছরের বন্ধকী ঋণের হার এক নয়, তবে দুটির মধ্যে বাজারগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে উচ্চ সুদের পরিবেশে বাড়ি কেনার মাসিক খরচ বাড়তে পারে। এপি জানিয়েছে, ফেডের সিদ্ধান্তের আগে যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধকী ঋণের হারও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে ছিল।
তবে সব মানুষের ওপর একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। কারও যদি নির্দিষ্ট সুদের হারের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধকী ঋণ থাকে, তাহলে ফেডের এই সিদ্ধান্তে তার মাসিক বাড়ির কিস্তি তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত নাও হতে পারে। অন্যদিকে পরিবর্তনশীল সুদের ঋণ থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলক দ্রুত দেখা দিতে পারে।
সঞ্চয়কারীদের জন্য আবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সুদের হার বাড়লে ব্যাংকের সঞ্চয় হিসাব, মেয়াদি আমানত বা অন্যান্য সুদভিত্তিক সঞ্চয়পণ্যে রিটার্ন বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কোন ব্যাংক কত সুদ দেবে, তা ব্যাংক ও নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভর করে।
ব্যবসায়ীদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান—যারা ব্যাংক ঋণ বা অন্যান্য ঋণের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের অর্থায়নের ব্যয় বাড়তে পারে। নতুন দোকান খোলা, যন্ত্রপাতি কেনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা কর্মী বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উচ্চ সুদের প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে সুদের হার বাড়ানোর উদ্দেশ্য শুধু ঋণ ব্যয় বাড়ানো নয়। এর মূল লক্ষ্য অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা কিছুটা কমিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ ও ব্যবসা যখন বেশি ব্যয়বহুল ঋণের মুখোমুখি হয়, তখন নতুন ঋণ নেওয়া ও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। এতে সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্যও এই খবরটি গুরুত্বপূর্ণ। যারা বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন, গাড়ির ঋণ নিচ্ছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন কিংবা ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বহন করছেন, তাদের মাসিক আর্থিক পরিকল্পনায় সুদের পরিবর্তন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাসসহ উচ্চ ব্যয়ের অঙ্গরাজ্যগুলোতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য বাড়ি, গাড়ি ও দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে ঋণের ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সুদের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে থাকা পরিবারের কাছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ পাঠানো মানুষের ক্ষেত্রেও ডলারের বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ফেড সুদের হার বাড়ালেই বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য নির্দিষ্ট হারে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিনিময় হার নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাজারসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
এদিকে শক্তিশালী খুচরা বিক্রির তথ্য দেখাচ্ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও মার্কিন ভোক্তাদের ব্যয় এখনো পুরোপুরি দুর্বল হয়নি। আগস্টে ১ দশমিক ২ শতাংশ খুচরা বিক্রির বৃদ্ধি অর্থনীতির স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বাড়তে থাকা আমদানি মূল্য ও জ্বালানি ব্যয় ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
ফেড এখন এমন একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে মূল্যস্ফীতি কমে আসে কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এ কারণে সামনে প্রকাশিত মূল্যস্ফীতি, চাকরির বাজার, ভোক্তা ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তথ্য পরবর্তী সুদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।