ইরানে ভেঙে পড়া বিমানে থাকা আহত মার্কিন সেনাকে বাঁচাতে সর্বাত্মক তৎপরতা

দুর্গম পাহাড়ে দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বাঁচলেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এক আহত বিমানসেনা।

ইরানে ভেঙে পড়া বিমানে থাকা আহত মার্কিন সেনাকে বাঁচাতে সর্বাত্মক তৎপরতা

ইরানে ভেঙে পড়া বিমানে থাকা আহত মার্কিন সেনাকে বাঁচাতে সর্বাত্মক তৎপরতা


ইরানের ভূখণ্ডে শত্রুভাবাপন্ন এলাকার ভেতরে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর চরম সংকটে পড়া এক সদস্যকে উদ্ধারে পরিচালিত ইতিহাসের অন্যতম বৈচিত্র্যময় সামরিক তৎপরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডিক্লাসিফাইড বা উন্মুক্ত করা বিভিন্ন তথ্য ও ভিডিওচিত্রে ফুটে উঠেছে কীভাবে প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মধ্যে একটি বিশেষ দল পরিচালনা করা হয়েছিল। ওই চালক মারাত্মক চোট পেয়ে পাহাড়ের কঠিন ভূখণ্ডে আটকে পড়েছিলেন। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখেও উদ্ধারকারী দল কোনো ধরনের বিরতি ছাড়া উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখে। মার্কিন বিমানবাহিনীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য বিবরণীতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ওই সময় একটি উন্নত যুদ্ধবিমান ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে এতে থাকা দুই কর্মী ভিন্ন দুই স্থানে জরুরি ভিত্তিতে বের হতে বাধ্য হন। বিমানের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে ও জরুরি অব অবতরণের সময় বাহিনীর দুই সদস্য সম্পূর্ণ আলাদা জায়গায় গিয়ে পড়েন।


দুজন সদস্যের মধ্যে একজনকে ঘটনার অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই শনাক্ত করে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তাকে নিয়ে প্রাথমিক সংশয় কাটলেও অন্য সদস্য দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের একটি দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় মারাত্মক জখম নিয়ে আটকা পড়ে থাকেন। জরুরি অবতরণের প্রবল আঘাতে তার শরীরের একাধিক স্থানের হাড় ভেঙে যায়। বিশেষ করে পিঠ, হাত ও কাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার নড়াচড়া করার ক্ষমতা ভীষণ কমে গিয়েছিল। এমন নিদারুণ শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি প্রায় দুই দিন ধরে দুর্গম এলাকায় নিজেকে গোপন রেখে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি জীবন রক্ষা করতে নিজের অবশিষ্ট শক্তি প্রয়োগ করে অপেক্ষাকৃত উঁচু একটি স্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, যাতে আকাশে নজরদারিতে থাকা মার্কিন উদ্ধারকারী যানগুলো তাকে সহজে শনাক্ত করতে পারে।


সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আহত সদস্য পাহাড়ের অত্যন্ত উঁচুতে থাকা একটি শৈলশিরার কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হন। তার নির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য আকাশে একাধিক সামরিক বিমান ও অনুসন্ধানকারী হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক মহড়া চালায়। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ ছিল না, কারণ চারপাশে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র টহল বাহিনীর উপস্থিতি সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল। উদ্ধারকারী বিশেষ দলের গতিবিধি প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একই সময়ে বেশ কয়েকটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমারু যান ও বিশেষ ড্রোন দিয়ে আশপাশের আকাশে নজরদারি জোরদার করা হয়। শত্রুপক্ষকে দূরে রাখা এবং একই সঙ্গে নিজ সদস্যের নিখুঁত অবস্থান বের করার জন্য একাধিক দলের মধ্যিখানে উচ্চমানের সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিমানবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষিত দুজন উদ্ধারকারী চরম ঝুঁকি নিয়ে ওই উঁচুতে থাকা শৈলশিরায় পৌঁছাতে সমর্থ হন। অসহনীয় শারীরিক কষ্ট আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাহাড়ি নির্জনতায় মার্কিন উদ্ধারকারীদের সামনে দেখতে পাওয়া আহত বিমানসেনার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন এক মুহূর্তের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে তিনি এই অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে ফেরার ঘটনাকে তার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হিসেবে স্মরণ করেন। উদ্ধারকারীরা তার কাছে পৌঁছানোমাত্র তিনি কেবল জীবন বাঁচানোর তাগিদে অবিলম্বে সেখান থেকে বের হওয়ার আকুতি জানান। সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার পথটি ছিল আরও বেশি জটিল ও রক্তঘাম করা এক সামরিক প্রচেষ্টা।


সংগৃহীত সামরিক উপাত্ত অনুযায়ী, উদ্ধার পর্বের একটি বিশেষ পর্যায়ে প্রায় একশজনের কাছাকাছি মার্কিন সেনা ইরান ভূখণ্ডের ভেতরে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ করেন। দুর্গম প্রাকৃতিক গঠন, তীব্র নিরাপত্তার হুমকি এবং অত্যন্ত জটিল পরিবহন ব্যবস্থার কারণে পুরো মিশন প্রতি পদে পদে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে অভিযান চলাকালীন উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত যানবাহন বা বিমান মরুভূমির শক্ত বালিতে আটকে গিয়ে এক বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করে। তবে সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সেনাসদস্যরা মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি পরিচালনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই আহত কর্মীকে সুরক্ষিতভাবে বিমানঘাঁটিতে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হন। পৃথক দুটি অভিযানের সফল সমাপ্তির মাধ্যমে উভয় সদস্যকেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। বিষয়টিকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা চরম সামরিক দক্ষতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।


বিশেষজ্ঞদের মতে, শত্রুভাবাপন্ন দেশের ভেতরের এলাকায় ঢুকে পড়া, নিখোঁজ জওয়ানকে খুঁজে বের করা এবং শত বাঁধা পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে তুলে আনা আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। বিমান, হেলিকপ্টার, আকাশপথের গোয়েন্দা নজরদারি ও আধুনিক সাজসরঞ্জামে সজ্জিত বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্যারারেস্কিউ দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই জটিল কাজ সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি যে সমস্ত ভিডিও চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তাতে সামরিক সমন্বয়ের আড়ালের অপরিসীম ঝুঁকি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যেকোনো মূল্যে নিজের কোনো সদস্যকে পেছনে ফেলে না আসার নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কত বড় মাপের জীবনবাজি রেখে অভিযান চালাতে হয়, এই ঘটনা তার একটি বড় নিদর্শন। চূড়ান্তভাবে পরিচালিত এই উদ্ধারপর্ব সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য নিদর্শন হয়ে থাকবে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর