সুদানে খাদ্য সহায়তার অর্থ অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় বাড়ছে ক্ষুধার ভয়াবহ সংকট

যুদ্ধের মধ্যে সুদানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অথচ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

সুদানে খাদ্য সহায়তার অর্থ অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় বাড়ছে ক্ষুধার ভয়াবহ সংকট

সুদানে খাদ্য সহায়তার অর্থ অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় বাড়ছে ক্ষুধার ভয়াবহ সংকট


সুদানে চলমান যুদ্ধ ও ভয়াবহ খাদ্যসংকটের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থায়ন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ জানিয়েছেন, চলতি বছরে সুদানে কর্মসূচিটির অর্থায়ন গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে যুদ্ধপীড়িত লাখো মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

রয়টার্সের ১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সুদানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার অর্থ পেয়েছিল। চলতি বছরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময় পেরিয়ে গেলেও অর্থায়ন দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। বর্তমান কার্যক্রম বজায় রাখতে সংস্থাটির আরও প্রায় ৩০ কোটি ডলার প্রয়োজন।

এই অর্থসংকট এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন সুদানে যুদ্ধের কারণে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং প্রায় ২ কোটি মানুষ ক্ষুধার মুখে রয়েছে বলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে চলা সংঘাত খাদ্য উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা, যোগাযোগ ও মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

অর্থের ঘাটতির কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জন্য সহায়তা ধরে রাখার চেষ্টা করছে; বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ আংশিক খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। অর্থের আরও ঘাটতি তৈরি হলে এই সহায়তার পরিমাণ আরও কমতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নিজস্ব তথ্যেও বলা হয়েছে, অর্থের ঘাটতির কারণে সংস্থাটি সবচেয়ে ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠীগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ৪০ লাখের বেশি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে দারফুর ও কর্দোফানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোও রয়েছে।

সুদানের খাদ্যসংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর নানা বাধা। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করে আসছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ায় ক্ষুধার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ২০২৬ সালে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে এবং ৮ লাখ ২৫ হাজারের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টির কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ইউনিসেফের যৌথ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে।

এর আগে এপ্রিলেও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছিল, অর্থের ঘাটতির কারণে সুদানে তাদের খাদ্য সহায়তা কমে গেছে। সংস্থাটি তখন ছয় মাসের জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে ৬০ কোটি ডলারের বেশি অর্থের প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিল।

শুধু সুদান নয়, বিশ্বজুড়ে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে খাদ্য সহায়তা, জরুরি কৃষি সহায়তা ও পুষ্টি কর্মসূচির অর্থায়ন আনুমানিক ৫৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বিভিন্ন সংকটপ্রবণ দেশে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আশঙ্কা, পর্যাপ্ত অর্থ না পাওয়া গেলে খাদ্য সহায়তার পরিধি আরও সংকুচিত করতে হবে। এতে যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়া পরিবারগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, নারী, বাস্তুচ্যুত পরিবার ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

সুদানের যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত খাদ্যসংকটের স্থায়ী সমাধানও কঠিন। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দ্রুত না এলে খাদ্য, পুষ্টি ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদানের মানবিক সংকট তাই শুধু যুদ্ধের সংকট নয়; অর্থায়নের ঘাটতিও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও কমে গেলে দেশটির ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর