শেখ মুজিব ও জিন্নাহ: সম্পর্ক কেমন ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে কার অবস্থান কী?
শেখ মুজিব ও জিন্নাহর রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দুই নেতার অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।
শেখ মুজিব ও জিন্নাহ: সম্পর্ক কেমন ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে কার অবস্থান কী?
বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দুজনই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। তবে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান, সময়কাল এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাধারা এক ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে মারা যান। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর কোনো সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার সুযোগ হয়নি।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তরুণ বাঙালি মুসলিম রাজনীতিক ও ছাত্রনেতা। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা এবং নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল।
শেখ মুজিবের প্রাথমিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই বাঙালিদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই শেখ মুজিব সক্রিয় ছিলেন। ১১ মার্চের ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার কারণে তিনি গ্রেপ্তার হন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলাদেশের সরকারি নথি ও Banglapedia-তেও তাঁর ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে।
একই বছরের মার্চে জিন্নাহ পূর্ব বাংলায় সফর করেন। ঢাকার রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উর্দু থাকবে। তবে বাংলা ভাষা প্রাদেশিক পর্যায়ে ব্যবহারের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেননি।
এই অবস্থানের বিরোধিতা করেন বাঙালি ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতারা। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। শেখ মুজিবও এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এ কারণে জিন্নাহ ও শেখ মুজিবের মধ্যে ভাষার প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল—এটি ঐতিহাসিকভাবে নথিবদ্ধ। তবে তাঁদের সম্পর্ককে সরাসরি ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে বর্ণনা করার মতো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না। একইভাবে তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের দাবির পক্ষেও পর্যাপ্ত প্রামাণ্য তথ্য নেই। তাঁদের সম্পর্ককে মূলত তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বাঙালির রাজনৈতিক অধিকারের প্রেক্ষাপটে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জিন্নাহর অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়কাল। তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
তাই জিন্নাহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বা বিপক্ষে ১৯৭১ সালের অর্থে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন—এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে করা যায় না। তবে তাঁর রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও তার ঐক্য ধরে রাখা। তাঁর জীবদ্দশায় পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করার প্রামাণ্য তথ্য নেই।
অন্যদিকে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অবস্থানও শুরু থেকেই সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালের পর তিনি পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাঙালিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়।
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ছয় দফা দাবি ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথিতেও ছয় দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ছয় দফার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করার এবং পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি সামনে আসে। সে সময়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিটি সরাসরি স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার দাবি ছিল না; বরং পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল।
এরপর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও পরিবর্তন করে। আওয়ামী লীগ ছয় দফাভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল বিজয় অর্জন করে। জাতীয় পরিষদে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এর ফলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে আসে।
কিন্তু নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনের ওপর তাঁর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়। এরপর সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।
এই ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অবস্থানকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত একই জায়গায় ছিল বলে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। তাঁর রাজনীতিতে ভাষার অধিকার থেকে রাজনৈতিক অধিকার, এরপর স্বায়ত্তশাসন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকে একটি ধারাবাহিক পরিবর্তন দেখা যায়।
অন্যদিকে জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সরাসরি সময়কালকে এক করে দেখা যায় না। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতা ছিলেন এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও কেন্দ্রীয় কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ঘটনাবলির সময় তিনি জীবিত ছিলেন না।
দুজনের রাজনৈতিক অবস্থান তুলনা করলে দেখা যায়, জিন্নাহর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সেটিকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে সংহত করা। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষাগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়।
তাই ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, জিন্নাহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন—এমন প্রমাণ নেই; আবার ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনের সরাসরি বিরোধিতা করার সুযোগও তাঁর ছিল না, কারণ তিনি ১৯৪৮ সালেই মারা যান। শেখ মুজিবও ১৯৪৭ সাল থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি নিয়ে রাজনীতি শুরু করেননি। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কয়েক দশকের আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের সংঘাতের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামে পৌঁছায়।
এই সময়কালগত পার্থক্যটি বিবেচনায় না নিয়ে জিন্নাহ ও শেখ মুজিবকে সরাসরি একই সময়ের স্বাধীনতা প্রশ্নে মুখোমুখি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।