কাতারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি চক্রের গোপন প্রচারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে

কাতারের মাধ্যমে হামাসের ওপর চাপ তৈরি করতে বিশেষ অভিযানের তথ্য ফাঁস করেছে ইসরায়েলি সংবাদপত্র।

কাতারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি চক্রের গোপন প্রচারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে

কাতারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি চক্রের গোপন প্রচারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে


সাতই অক্টোবরের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। সেই সময় কাতারকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব একটি গোপন তথ্যযুদ্ধ বা প্রচার অভিযান শুরু করে। সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎস এই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ, রাজনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তারা যুক্ত থেকে আন্তর্জাতিকভাবে এই বিভ্রান্তিকর প্রচার পরিচালনা করেছিলেন। 


 
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গাজা থেকে অপহৃতদের দ্রুত ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করাই ছিল এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য। তারা চেয়েছিল দোহাকে কোণঠাসা করে হামাসের ওপর দরকষাকষির প্রভাব বাড়াতে। কিন্তু মাত্র এক মাসের মাথায় রহস্যজনকভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।  


প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সাতই অক্টোবরের হামলার ঠিক কয়েকদিন পরেই একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দলের সূচনা হয়। প্রায় ত্রিশ জন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এই কাজে যুক্ত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিলেন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ডিজিটাল প্রচারণা বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম কৌশলবিদ। তাদের মূল কাজ ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাতারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং দেশটির ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।  
এই চক্রটির কাজের সুবিধার্থে একটি বিশেষ বার্তাপ্রেরণ গ্রুপ চালু করা হয়। সেখানে প্রতিদিন নতুন কৌশল নির্ধারণ করা হতো। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট খুলে, বিভিন্ন ভাষায় তথ্য ছড়িয়ে তৈরি করা হতো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামগ্রী। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, ভিডিও চিত্র নির্মাণ এবং সরাসরি সাক্ষাৎকার প্রচারের ব্যবস্থা করার কাজও করেছিল এই দলটি।  


তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমের পাতায় নেতিবাচক বক্তব্য প্রচার করে বার্তা ছড়াত। প্রচারণায় বলা হতো কাতার নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে এবং তাদের ওপর দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।  
কাতারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও সত্যতা যাচাই
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করা হয় কাতার সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করে থাকে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই সাহায্য পাঠাত কাতার। গাজার বেসামরিক জনগণের জন্য যে সহায়তা যেত, তা জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার তদারকিতেই পাঠানো হতো।  
কাতারি কর্মকর্তারা একাধিকবার স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন যে তাদের সহায়তা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছেই পৌঁছাত। পাশাপাশি গাজায় মধ্যস্থতা করার সুবিধার্থে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অনুরোধেই ২০১২ সালে রাজনৈতিক কার্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে ভিত্তিহীন ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে কাতারকে অপরাধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এই গোপন অভিযানের মাধ্যমে।  


হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পিছনের কারণ
হারেৎসের তথ্যমতে, প্রায় চার সপ্তাহ ধরে পুরোদমে চালানের পর হঠাৎ করেই এই সংক্রান্ত সব কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হয়। দলটির সদস্যদের জানানো হয় যে আর কোনো কাজ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ঠিক কী কারণে এটি হঠাৎ বন্ধ হলো, সে বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।  


বিশেষজ্ঞদের মতে, গোপন প্রচারের বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয় কিংবা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে বাধাগ্রস্ত না করতেই সিদ্ধান্তটি বদলানো হতে পারে। কাতার যেহেতু বন্দি বিনিময়ের আলোচনায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছিল, তাই তাদের সরাসরি আক্রমণ করা ইসরায়েলি সরকারের নিজেদের স্বার্থেরই পরিপন্থী হতে পারত। 



উত্তর-পশ্চিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোন্স এই বিষয়ে স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এই ধরনের পরিকল্পিত এবং বৃহৎ আকারের প্রচারণা কোনো একক নাগরিক গোষ্ঠীর কাজ হতে পারে না। এর পেছনে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও উৎসাহ ছিল একেবারেই স্পষ্ট।  
তিনি উল্লেখ করেন যে গত কয়েক বছর ধরেই কাতারের বিরুদ্ধে একই ধরনের অপপ্রচারের ধরন দেখা গেছে। যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতার মুহূর্ত আসে, তখনই এই ধরনের অসত্য তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। প্রচারণা বন্ধের কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, হয় এটি আড়াল করার কৌশল হিসেবে আপাতত থামানো হয়েছে, না হয় অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভিন্ন নামে কাজ চালানো হচ্ছে।  



মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে কাতার সবসময়ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ ধরনের ছদ্মবেশী মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আলোচনা প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং আন্তর্জাতিক
বর্তমানে হারেৎসের এই বিশদ বিবরণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়াও কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, এই ঘটনা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। অপপ্রচারের পেছনে থাকা ব্যক্তিবর্গের নাম গোপন রাখা হলেও, পুরো ঘটনাটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর