ক্যালিফোর্নিয়ায় শিক্ষা তহবিলের ৩.৯ বিলিয়ন ডলার আটকে দেওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা

সংবিধান সমর্থিত প্রোপজিশন ৯৮-এর আওতায় শিক্ষা খাতের ৩.৯ বিলিয়ন ডলার বাজেট আটকে রাখার অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে শিক্ষক সমিতি।

ক্যালিফোর্নিয়ায় শিক্ষা তহবিলের ৩.৯ বিলিয়ন ডলার আটকে দেওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা

ক্যালিফোর্নিয়ায় শিক্ষা তহবিলের ৩.৯ বিলিয়ন ডলার আটকে দেওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা


যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। রাজ্যের পাবলিক স্কুল এবং কমিউনিটি কলেজের জন্য নির্ধারিত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাজেট আটকে রাখার অভিযোগে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা দায়ের করেছে শিকাগো ও ক্যালিফোর্নিয়ার শক্তিশালী শিক্ষক সংগঠন ক্যালিফোর্নিয়া টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম এবং রাজ্য আইনপ্রণেতারা চলতি অর্থবছরের শিক্ষা বাজেট থেকে প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরিয়ে নিয়েছেন অথবা স্থগিত রেখেছেন। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ রাজ্যের দীর্ঘদিনের সংবিধান সমর্থিত শিক্ষা সুরক্ষা আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এর ফলে রাজ্যজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
মামলার নথি ও শিক্ষক সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ১৯৮৮ সালের ঐতিহাসিক ভোটার-অনুমোদিত আইন প্রোপজিশন ৯৮-এর আওতায় ক্যালিফোর্নিয়ার প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কমিউনিটি কলেজগুলোর জন্য প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ও সর্বনিম্ন আর্থিক তহবিল বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক। এই আইনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল যাতে অর্থনৈতিক মন্দা বা রাজস্ব সংকটের সময়ও শিক্ষা খাত কোনোভাবেই অবহেলিত না হয় এবং রাজ্য সরকার চাইলে মনগড়াভাবে এই অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার না করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, রাজ্য সরকার বর্তমান বছরের বাজেট সমন্বয় করতে গিয়ে ওই ন্যূনতম পাওনা থেকে অন্তত ৩.৯ বিলিয়ন ডলার বাদ দিয়েছে, যা রাজ্যের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।


শিক্ষক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রাজ্য সরকারের এমন সিদ্ধান্ত শিক্ষার মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সরকারি স্কুলগুলোতে বর্তমানে শ্রেণীকক্ষে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগে বড় ধরণের সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধানে নির্ধারিত ৩.৯ বিলিয়ন ডলার আটকে রাখা কোনো যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে অনেক স্থানীয় স্কুল জেলায় বাধ্য হয়ে নতুন শিক্ষক ছাঁটাই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, যা সরাসরি শ্রেণীশিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে। সরকারের নীতিপ্রণেতারা যদি এই আইন অমান্য করেন, তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারও বাজেটের ঘাটতি মেটাতে শিক্ষার বাজেটকে সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করবে, যা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে।


অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও গভর্নরের কার্যালয় থেকে অবশ্য এই তহবিল স্থগিত বা বিলম্বিত করার পক্ষে নিজস্ব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গত কয়েক বছরে রাজ্যের রাজস্ব আদায় এবং পুঁজিবাজারের ওপর ভিত্তি করে গঠিত কর প্রাপ্তিতে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাত ও শীর্ষ করদাতাদের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় রাজ্য সরকারের তহবিলে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকার পক্ষ দাবি করেছে, ৩.৯ বিলিয়ন ডলারের এই হিসাব মূলত অনুমিত রাজস্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। প্রকৃত রাজস্ব হাতে পৌঁছানো এবং পর্যালোচনা সম্পন্ন হওয়ার পরেই সঠিক পরিমাণ অর্থ ছাড় করা যৌক্তিক হবে। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপটি মূলত অর্থনৈতিক সতর্কতার অংশ এবং আগামীতে আরও বড় আর্থিক চাপ এড়াতেই এমন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার বড় ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হবে।
তবে শিক্ষক ইউনিয়ন এবং শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধিরা সরকারের এই যুক্তি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা জানিয়েছেন, সরকারের আর্থিক কৌশলের নামে সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করা কোনো সাধারণ হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার নাগরিকদের গণতান্ত্রিক রায়কে সরাসরি অবমাননা করার শামিল। যদি নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী অর্থ ছাড় করা না হয়, তবে চলতি শিক্ষাবর্ষেই বেশ কিছু জেলায় অর্থাভাবে বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম ও বিশেষ পাঠ্যসূচি বন্ধ করতে হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তামূলক প্রকল্প এবং বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো।


এই আইনি লড়াই শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাজেট ঘাটতির মধ্যে সরকারি খাতের খরচ কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সেই প্রশ্নে ক্যালিফোর্নিয়ার এই মামলাটি একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হয়ে থাকবে। আদালত যদি শিক্ষক ইউনিয়নের পক্ষে রায় দেয়, তবে গ্যাভিন নিউসামের প্রশাসনকে অবিলম্বে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারের উৎস নিশ্চিত করতে হবে এবং বিকল্প উপায়ে বাজেট সমন্বয় করতে হবে। আর যদি রায় সরকারের পক্ষে যায়, তবে দেশের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যেও শিক্ষা তহবিলের আইনি সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
আইনি লড়াই চলাকালীন সময়ে ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে স্থানীয় শিক্ষক সংগঠনগুলো এবং অভিভাবক সমিতিগুলোও সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা শুরু করেছে। রাজপথে আন্দোলন ও আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে ক্যালিফোর্নিয়ার শত শত সরকারি স্কুল ও লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর আগামী দিনের শিক্ষার মান। এই জটিল আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কার জয় হয় এবং রাজ্যের শিক্ষা বাজেট পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর