সৌদি আরবে হুথি হামলার পর সংহতি জানালেও সেনা পাঠাচ্ছে না পাকিস্তান

সৌদি যুবরাজ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় হলেও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য না পাঠানোর নীতি বজায় রাখছে ইসলামাবাদ সরকার।

সৌদি আরবে হুথি হামলার পর সংহতি জানালেও সেনা পাঠাচ্ছে না পাকিস্তান

সৌদি আরবে হুথি হামলার পর সংহতি জানালেও সেনা পাঠাচ্ছে না পাকিস্তান


মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং সতর্কতামূলক কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখছে পাকিস্তান। সম্প্রতি সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ ও সৌদি সরকারের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই সংহতি কেবল রাজকীয় সমর্থনের বার্তা এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। সৌদি আরবের সার্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকলেও দেশটি সরাসরি তাদের পদাতিক বা কোনো সামরিক বাহিনীকে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বা সৌদি সীমান্তে লড়াইয়ের জন্য পাঠাচ্ছে না।


ইসলামাবাদ থেকে প্রকাশিত সরকারি বার্তায় জানানো হয়েছে যে সৌদি আরবে অনাকাঙ্ক্ষিত এই ধরনের সামরিক হামলা কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেই বিনষ্ট করে না, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব বাজারের জ্বালানি তেলের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় সেখানকার সীমান্ত অস্থিরতা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের হামলার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বনেতাদের মতো পাকিস্তানও সমভাবে চিন্তিত।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সামরিক এবং কূটনৈতিক সহযোগী দেশ হিসেবে পরিচিত। দুটি দেশের মধ্যে বহু বছরের পুরনো এবং গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয়ে সৌদি আরব পাকিস্তানকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেছে। একইভাবে পাকিস্তানও ঐতিহাসিকভাবে সৌদি সামরিক বাহিনীকে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সামরিক পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে বর্তমান হুথি সংকটের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কোনো ধরনের সরাসরি সামরিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পদক্ষেপ নেওয়া থেকে নিজেদের দূরে রাখছে।


পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং কৌশলগত অবস্থান এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এমন একটি সময়ে কোনো বহিরাগত বা আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা পাকিস্তানের পক্ষে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এছাড়াও পাকিস্তানের সাথে প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেন বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তির সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ কৌশলগত নিরাপত্তার দিকটিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকদের মতে, কূটনৈতিকভাবে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং তাদের ভূখণ্ডের সুরক্ষার জন্য পাকিস্তান সবসময় সৌদি সরকারের পাশে থাকবে। কিন্তু সরাসরি অন্য দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে নিজস্ব বাহিনী মোতায়েন করা হলে তা অঞ্চলের রাজনৈতিক জটিলতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং উত্তেজনা হ্রাস করতে হলে সামরিক সংঘর্ষের বদলে সব পক্ষকে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক এবং কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করে পাকিস্তান।


আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সমঝোতা বেশ শক্তিশালী হলেও তা শর্তহীনভাবে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার তাগিদ দেয় না। মক্কা বা মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে পাকিস্তান সার্বক্ষণিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে আসলেও ভৌগোলিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে কোনো এক পক্ষের ওপর সরাসরি হামলা চালাতে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে যুক্ত করা থেকে সব সময়ই বিরত থেকেছে দেশটি। পাকিস্তানের এই অবস্থান তাদের আগের পররাষ্ট্রনীতিরই একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নির্দেশ করে।


সৌদি আরব এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্বের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিমান চলাচল, সমুদ্রপথে বাণিজ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক খনিজ তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়েছে। হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে চালানো এসব হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যদি নতুন করে সামরিক উত্তাপ বাড়তে থাকে, তবে তা অঞ্চলটির রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে পাকিস্তানও সমস্ত পক্ষকে সংঘাত এড়ানোর জন্য কূটনৈতিক আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার জোর তাগিদ দিয়ে আসছে।


সংসংক্ষেপে বলা যায়, বর্তমান আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে পাকিস্তান তাদের অন্যতম প্রধান মিত্র দেশ সৌদি আরবের প্রতি নীতিগত, নৈতিক এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক সমর্থন দেওয়া বজায় রাখবে। তবে বাস্তবভিত্তিক সামরিক কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে তারা সেখানে সরাসরি কোনো পদাতিক বা স্থল সেনাদল পাঠিয়ে এই যুদ্ধের সরাসরি অংশীদার হবে না। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সমর্থন বজায় রেখেই সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর