মরুভূমিতে ভেঙে পড়ল সৌদি ক্ষেপণাস্ত্র চীনা প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্

প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত চীনা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মরুভূমিতে ভেঙে পড়ার পর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করে ভিডিও প্রকাশ করেছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি।

মরুভূমিতে ভেঙে পড়ল সৌদি ক্ষেপণাস্ত্র চীনা প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্

মরুভূমিতে ভেঙে পড়ল সৌদি ক্ষেপণাস্ত্র চীনা প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্


মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের ভূখণ্ডে সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো চীন থেকে আমদানি করা একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছিল। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই মাঝ আকাশে যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হয় এবং জনমানবহীন মরুভূমিতে আছড়ে পড়ে। এই ব্যর্থ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে চীনা তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে।


বেশ কয়েক বছর ধরে চলা ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের কৌশলগত সামরিক উপস্থিতি অত্যন্ত জোরালো। এতদিন পর্যন্ত সৌদি বিমানবাহিনী প্রধানত পশ্চিমা প্রযুক্তির বিমান, নির্ভুল লক্ষ্যমাত্রার বোমারু অস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের রকেট ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু অতি সম্প্রতি রিয়াদের সামরিক বাহিনী তাদের গোপনীয় ব্যালিস্টিক রয়্যাল স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল ফোর্সের অস্ত্রাগার থেকে চীনা প্রযুক্তির অনুদান গ্রহণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে তা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ইয়েমেনের মারিব গভর্নরেটের রাঘওয়ান জেলায় একটি নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়েছিল।


সোশ্যাল মিডিয়া এবং খোলা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিস্তারিত ছবিতে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মরুভূমির বালুতে একটি বিশালাকার ব্যালিস্টিক মিসাইলের প্রধান বুস্টার পর্যায় এবং খণ্ডবিখণ্ড অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই ধ্বংসাবশেষটি চীনা সলিড-প্রপেল্যান্ট প্রযুক্তিতে তৈরি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের। ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হলেও এর অভ্যন্তরীণ প্রপালশন সিস্টেমে মারাত্মক গলযোগ ঘটেছিল। এর ফলে গতিপথ হারিয়ে এটি সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে মরুভূমির ওপর ভেঙে পড়ে।


যে অঞ্চলটিতে ক্ষেপণাস্ত্রটি আছড়ে পড়েছিল, সেটি বর্তমানে হুথি বিদ্রোহীদের শক্ত নিয়ন্ত্রণের অধীন। ব্যর্থ এই আক্রমণের পরপরই হুথি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করে বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে সামরিক গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যাওয়া সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে।


সামরিক বিশ্লেষকদের নজর এখন চীনা সামরিক প্রযুক্তির গুণগত মানের দিকে। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছ থেকে বেশ কিছু গোপনীয় প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গোপন আস্তানায় সংরক্ষিত থাকার পর যখন প্রথমবারের মতো এগুলো বাস্তব যুদ্ধে মোতায়েন করা হলো, তখনই তা চরমভাবে ব্যর্থ হলো। মধ্যপ্রাচ্যের চরম গরম ও মরুভূমির রুক্ষ আবহাওয়ায় চীনা অস্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী কার্যকারিতা বজায় রাখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বড় সামরিক শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে গুদামজাত করে রাখা ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি বা ইগনিশন সিস্টেমে কোনো ক্ষয় ধরেছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠছে।


ইয়েমেনের উত্তর ও মধ্যবর্তী মারিব অঞ্চল বর্তমানে ভয়াবহ যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। রিয়াদ তার মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে ক্রমাগত বিমান সহায়তা দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করে আসছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড পোস্ট, বিমানঘাঁটি এবং সরবরাহ রুটগুলোতে হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখতে সৌদি আরব তার সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে এই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।


এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে অত্যন্ত রহস্যময় নীরবতা বজায় রেখেছে সৌদি আরব সরকার এবং তাদের সামরিক দপ্তর। দেশটির সরকারি কোনো সংস্থা থেকে ঘটনার সত্যতা স্বীকার বা অস্বীকার করে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। একই সাথে এই বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক বিপত্তির মুখে চীনা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও সম্পূর্ণরূপে নীরব ভূমিকা পালন করছে। বেইজিংয়ের অস্ত্র রপ্তানি বাজারের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তাদের তৈরি অন্যতম প্রধান ব্যালিস্টিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা এখন বিশ্বের সামনে উন্মোচিত।


এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। কৌশলগত নৌপথ লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদাব প্রণালীতে হুথিরা ইতিমধ্যেই তাদের সামরিক তৎপরতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং অন্যদিকে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ সামরিক ঘাঁটিতে ঘন ঘন ড্রোন ও রকেট আক্রমণের মাধ্যমে তারা তাদের শক্ত অবস্থান জাহির করছে।


সৌদি আরবের সবচেয়ে গোপনীয় ব্যালিস্টিক রয়্যাল মিসাইল শক্তির এই প্রথম যুদ্ধকালীন ব্যবহার যেভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো, তা কেবল সৌদি কৌশলবিদদেরই হতাশ করেনি, বরং সমগ্র আরব উপদ্বীপে শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে রিয়াদকে এখন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সার্বিক সক্ষমতা ও আধুনিকীকরণ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হচ্ছে। এই ব্যর্থতা ভবিষ্যতে চীনা অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে সৌদির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারে এবং একই সাথে হুথি বাহিনীকে আরও দুঃসাহসী পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর