আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেন কুতুবদিয়ার নুদরাত ফারিহা ঐশী

কুতুবদিয়ার কৃতি সন্তান ফারিহা ঐশী আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে উচ্চতর ডক্টরেট গবেষণার সুযোগ পেয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেন কুতুবদিয়ার নুদরাত ফারিহা ঐশী

আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেন কুতুবদিয়ার নুদরাত ফারিহা ঐশী


কক্সবাজারের সমুদ্রবেষ্টিত এক শান্ত দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া। এখানকার সাধারণ ভৌগোলিক পরিবেশ থেকে উঠে এসে বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের নাম লেখানো এক অসাধারণ কীর্তি। এই অভাবনীয় সাফল্যের নায়িকা নুদরাত ফারিহা ঐশী। দ্বীপের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আজ পাড়ি জমিয়েছেন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পাঁচ বছর মেয়াদি পূর্ণ অর্থায়নে সরাসরি স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত মেধার স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি অত্যন্ত গৌরবময় মুহূর্ত। দ্বীপের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে গবেষণার সুযোগ পাওয়া সত্যিই বিরল ও অনুপ্রেরণাদায়ক।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে গোল্ডেন জিপিএ পাঁচ অর্জন করেছিলেন নুদরাত ফারিহা। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ও দূরদর্শী ফারিহা নিজের লক্ষ্যের ব্যাপারে সর্বদা সচেতন ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে অত্যন্ত সফলতার সাথে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তবে তার স্বপ্নের পরিধি কেবল একটি সাধারণ স্নাতক ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। উচ্চশিক্ষার দুর্গম পথে হাঁটার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিজপোর্ট থেকে বিজনেস অ্যানালিটিক্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সেখানে পড়াশোনাকালে তিনি বিশ্বমানের শিক্ষা পদ্ধতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় তার অসামান্য দক্ষতা ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন।
উচ্চশিক্ষার এই কণ্টকাকীর্ণ পথে ফারিহা ঐশীকে অদম্য ধৈর্য, দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত আন্তর্জাতিক যোগ্যতা পরীক্ষা গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড এক্সামিনেশনে তিনি অত্যন্ত চমৎকার ও প্রশংসনীয় ফলাফল অর্জন করেন। এরপর শুরু হয় আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদন করার অত্যন্ত জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। কঠোর পরিশ্রম, গভীর মনোযোগ ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফলস্বরূপ তিনি আমেরিকার অন্যতম সেরা ও নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পিএইচডি গবেষণার ডাক পান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার মেধা, পূর্বের চমৎকার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সুনির্দিষ্ট গবেষণা পরিকল্পনার মূল্যায়ন করে তাকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত এই সম্মানজনক সুযোগ প্রদান করেছে।


নুদরাত ফারিহা ঐশী কুতুবদিয়ার দক্ষিণ ধুরং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সুযোগ্য চেয়ারম্যান এবং দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জালাল আহমেদের আদরের নাতনী। তার পিতা জাফর আহমেদ পেশায় একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যাংকার এবং মাতা লাভলী আক্তার একজন নিবেদিতপ্রাণ গৃহিণী। পরিবারের এমন শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ এবং নৈতিক মূল্যবোধ তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ও মানসিক বিকাশে গভীর ভূমিকা রেখেছে। নুদরাতের এই যুগান্তকারী সাফল্যে বর্তমানে তার পরিবার, নিকটাত্মীয়, এলাকার সাধারণ মানুষ এবং তার বন্ধু মহলে আনন্দের জোয়ার বইছে। সকলেই তার এই অভূতপূর্ব অর্জনে গর্ববোধ করছেন এবং তার আগামী দিনের শিক্ষা ও গবেষণামূলক কাজের জন্য নিরন্তর শুভকামনা জানাচ্ছেন।


আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার এই বিশাল অর্জনের পেছনের গভীর ভাবনার কথা বলতে গিয়ে ফারিহা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তার এই দীর্ঘ সাধনার মূল লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত পদবী অর্জন নয়। পিএইচডি চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে অর্জিত সমস্ত উন্নত একাডেমিক জ্ঞান, তথ্যনির্ভর গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবমুখী পেশাগত দক্ষতা তিনি দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত করতে চান। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প, হসপিটালিটি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিজস্ব গবেষণার প্রভাব ফেলার গভীর স্বপ্ন দেখেন তিনি। বিদেশের বিশ্বমানের পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা দেশে ফিরিয়ে এনে জাতীয় অগ্রযাত্রায় অবদান রাখাই তার মূল উদ্দেশ্য।
নুদরাত ফারিহা ঐশীর এই অনুপ্রেরণাদায়ী জীবনের গল্প দেশের কোটি তরুণের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের জন্মস্থান বা প্রাথমিক পারিপার্শ্বিক সীমা কখনো তার ভবিষ্যতের চরম সাফল্যকে আটকে রাখতে পারে না। কঠোর শ্রম, অটল লক্ষ্য এবং একাগ্রতা থাকলে যেকোনো মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম। আজকের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কুতুবদিয়ার মতো এক সাধারণ দ্বীপ থেকে আমেরিকার প্রথম সারির গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গা করে নেওয়া বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রায় এক নতুন ইতিহাস যুক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই কৃতিত্ব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সম্ভাবনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নুদরাত ফারিহার মতো মেধাবী তরুণ গবেষকরা যখন বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তা হাজারো উদীয়মান শিক্ষার্থীকে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখায়। তার এই সাফল্য আগামী দিনে শিক্ষা, গবেষণা ও দেশ গঠনে আরও বহু তরুণকে নিরলস পরিশ্রম করার শক্তি জোগাবে। সঠিক প্রস্তুতি, সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা এবং অবিচল নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে তার সামনের দিনগুলোর প্রতিটি গবেষণা সফল ও সমৃদ্ধ হোক, দেশের মান উজ্জ্বল হোক এবং অর্জিত জ্ঞান মানবসেবায় চিরস্থায়ী ভূমিকা রাখুক—এটিই আজ সমগ্র দেশবাসীর একান্ত প্রত্যাশা ও আন্তরিক কামনা।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর