ঈদে বাড়ি এসে বিয়ের স্বপ্ন ছিল শরিফুলের, মালয়েশিয়ায় মাটিচাপায় মৃত্যু

ঈদে দেশে ফিরে বিয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল, কিন্তু মালয়েশিয়ায় কর্মস্থলে মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়ে থেমে গেল তাঁর সব স্বপ্ন।

ঈদে বাড়ি এসে বিয়ের স্বপ্ন ছিল শরিফুলের, মালয়েশিয়ায় মাটিচাপায় মৃত্যু

ঈদে বাড়ি এসে বিয়ের স্বপ্ন ছিল শরিফুলের, মালয়েশিয়ায় মাটিচাপায় মৃত্যু


‘ফুফু, কুরবানির ঈদে বাড়ি আসব। ভালো একটা ঘর করে বিয়ে করব। তোমরা মেয়ে দেখে রেখ।’ মৃত্যুর মাত্র এক রাত আগে স্বজনের সঙ্গে ফোনে এমন কথাই বলেছিলেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার প্রবাসী শ্রমিক শরিফুল ফকির। দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরার স্বপ্ন, পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন এবং নতুন সংসার শুরু করার পরিকল্পনা সবকিছুই যেন সাজানো ছিল তাঁর মনে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই মালয়েশিয়ায় কর্মস্থলে মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মালয়েশিয়ায় কাজ করার সময় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শরিফুল ইসলাম ফকির গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের বর্ণি গ্রামের নজরুল ফকিরের ছেলে। তাঁর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। একদিকে ছেলেকে হারানোর শোক, অন্যদিকে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তাঁর স্বজনেরা।

শরিফুলের ফুফু বিলকিস বেগম জানান, মৃত্যুর আগের রাতেও তাঁর সঙ্গে শরিফুলের ফোনে কথা হয়েছিল। তখন শরিফুল দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কুরবানির ঈদে বাড়ি আসবেন, ভালোভাবে ঘর তৈরি করে বিয়ে করবেন এবং এজন্য স্বজনদের মেয়ে দেখতে বলেছিলেন। ফুফুও তাঁকে দেশে ফিরে আসার পর মেয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে সেই স্বপ্নের মানুষটির মৃত্যুর খবরই শুনতে হয় তাঁকে।

বিলকিস বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, শরিফুল ছিলেন হাসিখুশি ও সবার প্রতি সম্মান দেখানো একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন স্বজনেরা। মৃত্যুর আগের রাতের কথোপকথন তাই এখন পরিবারের কাছে আরও বেশি কষ্টের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে মানুষটি পরদিনও ফোন করে কথা বলবেন বলে স্বজনেরা ভেবেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর খবরই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের শুনতে হয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, জীবিকার তাগিদে কয়েক বছর আগে শরিফুল মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে আয় করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। তাঁর উপার্জনের ওপর পরিবারের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল ছিল বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

শরিফুলের বাবা নজরুল ফকির জানান, তাঁদের পরিবারে শরিফুলই ছিলেন প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব অনেকটাই তাঁর ওপর ছিল। তাই ছেলের আকস্মিক মৃত্যু শুধু একজন স্বজনকে হারানোর ঘটনা নয়, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় সংকট তৈরি করেছে।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় একটি নালা নির্মাণের কাজের জন্য মাটি কেটে রাখা হয়েছিল। কাজের সময় শরিফুল সেই অংশে নামার পর হঠাৎ মাটি ধসে তাঁর ওপর পড়ে। সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারিগরি কারণ বা কর্মস্থলে নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বিস্তারিত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার স্থান ও ঘটনার কিছু বিবরণে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। তবে শরিফুলের পরিচয়, টুঙ্গিপাড়ার বর্ণি ইউনিয়নের বাসিন্দা হওয়া, ১৪ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে মাটিচাপায় তাঁর মৃত্যু এবং দেশে ফেরার পর বিয়ে করার পরিকল্পনার বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনে মিল রয়েছে।

শরিফুলের মা নাসি বেগমের জন্য ছেলের মৃত্যু যেন সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। তিনি ছেলের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। ছেলে দেশে এলে কুরবানির ঈদ পরিবারের সঙ্গে কাটাবেন এবং এরপর তাঁর বিয়ে দেওয়া হবে—এমন পরিকল্পনাও করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ছেলের বিয়ের জন্য ঘর গোছানোর কাজও করা হয়েছিল বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। কিন্তু সেই ঘরেই এখন আনন্দের পরিবর্তে শোকের পরিবেশ।

মায়ের কাছে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, ছেলে দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারেননি। যে ছেলের নতুন সংসার শুরুর কথা ছিল, সেই ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় এখন পরিবার। স্বজনদের আকুতি, অন্তত শেষবারের মতো তাঁরা যেন শরিফুলের মুখ দেখতে পারেন।

শরিফুলের ছোট ভাই শিপুল ফকির জানান, তাঁর ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। পরিবারের উন্নতি করা, ঘরবাড়ি ঠিকঠাক করা এবং বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করা—এসব নিয়েই তিনি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের মেয়েও দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনাগুলোর কোনোটি আর বাস্তবায়িত হলো না।

প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শরিফুলের পরিবার আগে থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর এক ভাই অল্প বয়সে মারা যান এবং আরেক ভাইয়ের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে সমস্যা রয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফলে পরিবারের দায়িত্বের একটি বড় অংশ শরিফুলের ওপর এসে পড়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

শরিফুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বর্ণি গ্রামের বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন। এলাকায় নেমে আসে শোকের আবহ। স্বজনদের চোখে এখন শুধু একটাই আকুতি মালয়েশিয়া থেকে দ্রুত শরিফুলের মরদেহ দেশে আনা হোক। বাবা নজরুল ফকিরও শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চান বলে জানিয়েছেন।

স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও স্বজনেরা মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। বর্ণি ইউনিয়নের স্থানীয় নেতারাও পরিবারের পাশে থাকার কথা বলেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়টি জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রবাসে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন শরিফুল। কয়েক বছরের শ্রম, কষ্ট ও অপেক্ষার পর দেশে ফিরে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু বিদেশের কর্মস্থলে একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা সেই স্বপ্নের সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।

শরিফুলের ঘটনা আবারও প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। বিদেশের মাটিতে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। নির্মাণ ও মাটি কাটার মতো কাজে মাটি ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরিফুলের মৃত্যুর ঘটনায় দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, কর্মস্থলে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কীভাবে দেখছে এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তবে এখন শরিফুলের পরিবারের কাছে এসব প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে শেষ বিদায়ের অপেক্ষা। যে পরিবার ঈদের দিন ছেলেকে ঘরে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পরিবার এখন প্রিয় মানুষটির মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায়। যে ঘরে বিয়ের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন শোকের কান্না।

মালয়েশিয়ার মাটিতে থেমে গেছে শরিফুলের জীবন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্বপ্নগুলো এখন পরিবারের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে। ঈদে বাড়ি ফেরার কথা, বিয়ের কথা, নতুন ঘর সাজানোর কথা—মৃত্যুর আগের রাতের সেই কথাগুলোই এখন স্বজনদের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে থাকবে।

এক রাত আগেও যে মানুষটি ফুফুকে বলেছিলেন, ‘মেয়ে দেখে রেখো’, পরদিন তাঁর জন্যই স্বজনদের বলতে হচ্ছে শেষবারের মতো যেন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। শরিফুলের অপূর্ণ স্বপ্ন আর পরিবারের এই শোক প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতার এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে রইল।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর