কারাগারেই কন্যাসন্তানের জন্ম ফিলিস্তিনি বন্দি দানার, মুক্তির পর নবজাতকসহ হাসপাতালে
ইসরায়েলের কারাগারেই কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেন ফিলিস্তিনি বন্দি দানা জুদেহ, ছয় মাসের বন্দিজীবন শেষে নবজাতকসহ পেলেন মুক্তি ও চিকিৎসা সেবা।
কারাগারেই কন্যাসন্তানের জন্ম ফিলিস্তিনি বন্দি দানার, মুক্তির পর নবজাতকসহ হাসপাতালে
ইসরায়েলের ড্যামন কারাগারে বন্দি অবস্থায় কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী দানা ইনাদ জুদেহ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ওই রাতেই তাকে নবজাতকসহ মুক্তি দেওয়া হয়েছে। পরে মা ও শিশুকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রামাল্লার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দানা জুদেহ পশ্চিম তীরের নাবলুস গভর্নরেটের ইরাক আল-তাইয়েহ এলাকার বাসিন্দা। ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, তিনি আগে থেকেই এক সন্তানের মা। গত ১৮ এপ্রিল তাকে গর্ভবতী অবস্থায় আটক করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। পরে তাকে ছয় মাসের প্রশাসনিক আটকাদেশ দেওয়া হয়। অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তাকে বন্দি রাখা হয়েছিল।
ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক সংস্থাগুলোর দাবি, গর্ভাবস্থার একটি বড় সময় দানাকে কারাগারেই কাটাতে হয়েছে। এ সময় তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পর্যাপ্ত পুষ্টি ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। জুনে ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি দানাসহ তিন গর্ভবতী ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপও চেয়েছিল। সংস্থাটি তখন অভিযোগ করেছিল, গর্ভবতী বন্দিরাও কারাগারে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা, খাদ্যসংকট ও মানসিক চাপের মুখে রয়েছেন।
গ্রেপ্তারের আগে দানার গ্যাস্ট্রিক স্লিভ সার্জারি হয়েছিল। ফলে তার বিশেষ খাদ্যাভ্যাস, ভিটামিন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন ছিল বলে ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক সংগঠনগুলোর বরাতে জানিয়েছে প্যালেস্টাইন ইনফরমেশন সেন্টার। কিন্তু বন্দি অবস্থায় এসব প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সোমবার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। দানার প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পর তাকে কোনো বেসামরিক হাসপাতালে নিয়ে প্রসব করানোর পরিবর্তে ড্যামন কারাগারেই সন্তান জন্ম দিতে হয় বলে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দি ও সাবেক বন্দিবিষয়ক কমিশনও নিশ্চিত করেছে যে দানা ড্যামন কারাগারে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বন্দি ও সাবেক বন্দিবিষয়ক কমিশন। সংস্থাটি দানা ও তার নবজাতকের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও কারা প্রশাসনের ওপর দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, গর্ভবতী অবস্থায় দানাকে আটক করা, প্রশাসনিক আটকাদেশে রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধের লঙ্ঘন। কারাগারের ভেতরে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়াকে তারা ‘দ্বিগুণ অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
দানার ছয় মাসের প্রশাসনিক আটকাদেশ শেষ হওয়ার সময় একেবারে কাছেই ছিল। প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তার মুক্তি পাওয়ার কথা। তবে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সোমবার রাতেই তাকে নবজাতকসহ মুক্তি দেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে, জেনিনের কাছে আল-জালামা চেকপয়েন্ট দিয়ে মা ও শিশুকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে তাদের রামাল্লার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আল জাজিরার মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্তির পর দানা ও তার নবজাতককে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারে ৯ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন; তাদের মধ্যে প্রায় ৯২ জন নারী এবং ৩৭০ জন শিশু।
দানাই একমাত্র গর্ভবতী ফিলিস্তিনি নারী নন যিনি ড্যামন কারাগারে আটক ছিলেন। জুনে ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছিল, সেখানে দানার পাশাপাশি আমিনা আল-তাওয়িল ও মানার ইব্রাহিম নামে আরও দুই গর্ভবতী নারী আটক ছিলেন। পরবর্তী প্রতিবেদনে আরও গর্ভবতী বন্দির কথাও উঠে এসেছে।
তবে দানার চিকিৎসা পরিস্থিতি ও কারাগারে তার সঙ্গে আচরণ নিয়ে যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক সংগঠন ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি।
কারাগারে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছেন দানা জুদেহ। কিন্তু গর্ভাবস্থায় ছয় মাসের বন্দিজীবন এবং কারাগারের ভেতর সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে ইসরায়েলের প্রশাসনিক আটকনীতি ও গর্ভবতী ফিলিস্তিনি বন্দিদের চিকিৎসা ও মানবিক পরিস্থিতি।