লোহিত সাগরের দুই কৌশলগত দ্বীপ দখল হুতিদের, ঝুঁকিতে সৌদি তেল ও বিশ্ব বাণিজ্য
লোহিত সাগরের দুই কৌশলগত দ্বীপ দখল করল হুতিরা, হুমকির মুখে সৌদি তেল রপ্তানি ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা।
লোহিত সাগরের দুই কৌশলগত দ্বীপ দখল হুতিদের, ঝুঁকিতে সৌদি তেল ও বিশ্ব বাণিজ্য
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হলো। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে।
সোমবার হুতি কর্মকর্তারা দুই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা জানান। একই সময়ে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেবের আশপাশে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দক্ষিণ লোহিত সাগরের এমন একটি এলাকায় অবস্থিত, যার কাছেই বাব আল-মান্দেব প্রণালি। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল ব্যবহার করে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
দুই দ্বীপ দখলের আগে হুতিরা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা এবং বাব আল-মান্দেবের একটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ইয়েমেনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অগ্রযাত্রার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শান্তিকালে বিশ্বের বাণিজ্য হওয়া তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
হরমুজে সংকট তৈরি হওয়ার পর সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল পশ্চিমাঞ্চলের লোহিত সাগর উপকূলে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। পাইপলাইনটি সৌদি আরবের তেলকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের দিকে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।
এই পাইপলাইন দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৬ লাখ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছিল বলে জ্বালানি বিশ্লেষকদের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে AP। সর্বোচ্চ হিসাবে এটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
এমন পরিস্থিতিতে লোহিত সাগরেও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি সৌদি আরবের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার দিকে যাওয়া জাহাজগুলোকে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দেব অতিক্রম করতে হয়। হুতিদের অবস্থান এই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী হলে সৌদি তেল পরিবহনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হুতিরা সম্প্রতি সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ঘোষিত অবরোধের অংশ হিসেবেই এসব অভিযান চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে হুতিরা দাবি করেছে, তারা অন্য দেশের সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে চায় না।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মঙ্গলবার জানিয়েছে, ২০ জুলাই থেকে ২৪ আগস্টের মধ্যে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুতিদের অন্তত তিনটি হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। সংস্থাটি বেসামরিক জাহাজের ওপর বেআইনি হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নয়, ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধকেও নতুন করে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর দেশটিতে বড় আকারের লড়াই অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে নতুন করে সংঘাত বাড়ার পর ইয়েমেনে প্রায় ৯৪ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তায়েজ ও লাহজ অঞ্চলের মানুষ। সেখানে প্রায় ৪৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দুই হাজারের বেশি ইয়েমেনি বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে জিবুতিতেও আশ্রয় নিয়েছেন।
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়ের জন্য প্রায় ২০০টি স্কুল ব্যবহার করা হচ্ছে। যুদ্ধ আবার পুরোদমে শুরু হলে দেশটির মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত এক সপ্তাহের সংঘাতে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইয়েমেনের সরকার-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে পশ্চিম উপকূলের লড়াইয়ে তাদের পাঁচ শতাধিক যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে এক হাজারের বেশি হুতি যোদ্ধা নিহত হওয়ার দাবিও করেছে তারা। তবে হুতিদের হতাহতের এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
হুতিদের অগ্রযাত্রা ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দেবের অপর পাশে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ক্যাম্প লেমনিয়ার অবস্থিত। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার ফলে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ওই মার্কিন ঘাঁটি থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছেছে।
জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন, ফ্রান্স ও জাপানেরও সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ফলে বাব আল-মান্দেব ঘিরে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে এর প্রভাব ইয়েমেন ও সৌদি আরবের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার হুতি পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, ইয়েমেনের তায়েজ প্রদেশে সৌদি বিমান হামলায় দুই শিশুসহ তিনজন নিহত এবং আরও দুজন আহত হয়েছেন। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস স্বাধীনভাবে এই দাবি যাচাই করতে পারেনি।
লোহিত সাগরের দুই কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যাওয়ায় এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে। হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্যে বাব আল-মান্দেবেও বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাহাজের বিমা ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, বিকল্প দীর্ঘ সমুদ্রপথ ব্যবহার এবং তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামও আরও বাড়তে পারে।
গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপ দখলকে শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের আরেকটি সামরিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, সৌদি তেল রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে এই দুই ছোট দ্বীপ এখন বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য নিরাপত্তার নতুন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।