ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি চুড়ান্ত করতে দিল্লিতে বৈঠক
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন দলের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর এটি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি রাজনৈতিক বৈঠক হতে যাচ্ছে। বৈঠকে দলের সাংগঠনিক অবস্থা, দেশে ও বিদেশে থাকা নেতাকর্মীদের পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি চুড়ান্ত করতে দিল্লিতে বৈঠক
দলীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের একটি বড় অংশ বৈঠকে অংশ নেবেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তবে বৈঠকের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২৩ জন কেন্দ্রীয় নেতার কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকের সামনে দুটি বড় বিষয়
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়ার বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। তিনি বৈঠকের কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা থাকার কথা বলেননি।
তবে দলটির ইউরোপভিত্তিক একজন সাংগঠনিক নেতা জানিয়েছেন, বৈঠকে মূলত দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে নেতাদের মতামত নেওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ, বৈঠকটি শুধু সাংগঠনিক পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতিও এর অংশ হবে, সেটিই এখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা
শেখ হাসিনা এরই মধ্যে প্রকাশ্যে ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। তিনি তাঁর ফেরাকে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে একটি রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
এরপর ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলনেও তিনি ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর বক্তব্যকে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের স্পষ্ট ঘোষণা হিসেবে তুলে ধরে।
প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সময়সীমা ঘোষণার পর এখন দিল্লির বৈঠককে সেই পরিকল্পনার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা।
স্থল না আকাশপথ, কোন পথে ফিরবেন?
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার একাধিক সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে দলীয় নেতাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিমানপথ ও স্থলপথ—দুই ধরনের সম্ভাবনাই বিবেচনায় রয়েছে।
পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে প্রবেশের একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথাও দলীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে ‘লং মার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’ ধরনের কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে বলেও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা জানিয়েছেন।
তবে এসব পরিকল্পনার কোনোটিই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
টুঙ্গিপাড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে টুঙ্গিপাড়ার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সেখানে।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য, এ কারণেই দেশে ফেরার ক্ষেত্রে টুঙ্গিপাড়াকে ঘিরে রাজনৈতিক কর্মসূচির চিন্তা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয় বিবেচনা করেই চূড়ান্ত রুট নির্ধারণ করা হবে।
তিনি দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী রাস্তায় নামবেন।
তবে এই ধরনের জনসমাগম বা কর্মসূচি বাস্তবে কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতির ওপর।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থাও আলোচনায়
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো বড় ধরনের সংকটে পড়ে। দলের শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ দেশ ছাড়েন, অনেকে আত্মগোপনে চলে যান এবং অনেকে গ্রেপ্তার হন।
২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে বলা হয়েছে, দলের কার্যক্রমের বড় অংশ এখন অনলাইন যোগাযোগ ও সীমিত কিছু কর্মসূচিনির্ভর।
এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নতুন করে বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে বলেও দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। যারা ৫ আগস্টের পরও সক্রিয় ছিলেন এবং রাজনৈতিক চাপ বা মামলার মুখে ছিলেন, তাদের নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
ফলে ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠনে শুধু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয় নয়, দেশে-বিদেশে থাকা নেতাদের মধ্যে কে কীভাবে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফেরার পরিকল্পনা কি শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা?
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রম, তাঁর অনুপস্থিতিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড এবং তাঁকে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের কাছে করা অনুরোধ—সব মিলিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চাইছে এবং ভারত বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার আলোকে পর্যালোচনা করছে।
শেখ হাসিনা অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।
দিল্লির বৈঠক তাই গুরুত্বপূর্ণ
এই বাস্তবতায় ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠককে আওয়ামী লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরামর্শ সভা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেখানে ভারতের বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত নেতাদের কাছ থেকে দেশের সাংগঠনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি তথ্য নেওয়ার সুযোগ পাবেন শেখ হাসিনা।
একই সঙ্গে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে কতটা প্রস্তুতি রয়েছে, নেতাকর্মীদের অবস্থান কী, দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কোন পথ অপেক্ষাকৃত বাস্তবসম্মত এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে—এসব বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের মূল আলোচনার একটি বড় অংশ হতে পারে শেখ হাসিনার কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভাব।
সামনে আরও একটি ঘোষণা?
দলীয় নেতাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনা অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লি থেকে তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আরও একটি প্রকাশ্য বক্তব্য বা সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও শেখ হাসিনার অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে আছে। আগস্টে দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকার উদ্বেগ জানায় এবং ভারত জানায়, ওই বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই।
সব মিলিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বরের দিল্লি বৈঠক আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তব রাজনৈতিক পরিকল্পনায় রূপ নেয়, নাকি এটি দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় করার একটি কৌশল—তা বোঝার জন্য এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।