মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মাঝে মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের বিমান উড্ডয়ন ও সার্বিক সামরিক প্রস্তুতি

আরব সাগরে অবস্থানরত মার্কিন রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন থেকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় দিনরাত চলছে যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ প্রশিক্ষণ।

মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মাঝে মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের বিমান উড্ডয়ন ও সার্বিক সামরিক প্রস্তুতি

মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মাঝে মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের বিমান উড্ডয়ন ও সার্বিক সামরিক প্রস্তুতি


আরব সাগরের বুকে ভাসমান যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী বিশাল রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনে এখন চরম ব্যস্ততা ও সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা। ইরান ও তার সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা এবং হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে প্রভাব বজায় রাখতে কৌশলগত ভূমিকা পালন করছে মার্কিন নৌবাহিনীর এই বহর। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের মধ্যে সমুদ্রসীমায় অবরোধ জোরদার করতে দিনরাত নিরবচ্ছিন্ন সামরিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। 


 
ফক্স নিউজের মুখ্য আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ট্রে ইয়িংস্ট সরাসরি রণতরীটির রণসজ্জা ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এক বিশেষ চিত্র তুলে ধরেছেন। তার প্রতিবেদনে দেখা যায়, রণতরীর বিশাল উড্ডয়ন মঞ্চ বা ফ্লাইট ডেকে কোনো বিরতি নেই। দিন কিংবা রাতের অন্ধকারে লাল রঙের বিশেষ সতর্কতামূলক আলোয় মুড়িয়ে চলছে অত্যাধুনিক এফ-১৮ এবং পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ প্রক্রিয়া। রণতরী থেকে ক্রমাগত বিকট শব্দে টেক অফ করছে যুদ্ধবিমানগুলো, যা পুরো এলাকাকে এক রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।  


রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন একটি নিমিটজ-শ্রেণীর পরমাণু শক্তিচালিত সুপারক্যারিয়ার। এখানে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি নাবিক, বিমান চালক ও সামরিক কর্মী সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। সমুদ্রের ওপর ভাসমান এই শহরটিতে যেকোনো মুহূর্তের সংকেতে আকাশে উড়তে প্রস্তুত রাখা হয়েছে একাধিক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান ও সামরিক হেলিকপ্টার। নাবিক ও প্রকৌশলীরা ইঞ্জিনের সুরক্ষার পাশাপাশি সমরাস্ত্র সংযোজন, ফুয়েল রিফুয়েলিং এবং সার্বিক যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলো পরিচালনা করছেন এক নিখুঁত শৃঙ্খলার মাধ্যমে। প্রতি সেকেন্ডের হিসাব রেখে কাজ করছেন ডেক ক্রুরা, কারণ সামান্য ভুলও বিশাল বিপদের কারণ হতে পারে।  


আরব সাগরে এই বিশাল রণতরী একা অবস্থান করছে না। এর সুরক্ষায় এবং আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চারপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী জাহাজ। এর মধ্যে ইউএসএস শোপ নামের একটি ধ্বংসকারী জাহাজ বিমানবাহী জাহাজটির আকাশসীমা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের নিরাপত্তায় কাজ করছে। শোপ জাহাজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা বিমানবাহী রণতরীকে সম্ভাব্য দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা থেকে রক্ষা করতে ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার ব্যবস্থা সমন্বয় করছেন। সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকা এসব জাহাজ শত্রুর যেকোনো হুমকি মুহূর্তে চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে সক্ষম। 


 
ইরানের পক্ষ থেকে আসা হুমকি এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে চলাচলের সংকটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্য হলো ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখা, যাতে তেল পরিবহন এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর বড় কোনো বাধা না আসে। একদিকে ডব্লিউ ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যদিকে সমুদ্রে এই ধরনের দৃশ্যমান সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন—উভয় মাধ্যমেই ওয়াশিংটন প্রতিপক্ষকে কড়া বার্তা দিচ্ছে।  


ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগর এবং বাব এল-মানদেব প্রণালীর দিকে অগ্রসর হওয়ার খবরের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী এই স্ট্রাইক গ্রুপের তৎপরতা আরও বাড়োনো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের উপস্থিতি যেকোনো সম্ভাব্য স্থল ও আকাশপথের হামলাকে সরাসরি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে। স্থলভিত্তিক সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর না করে সমুদ্র থেকেই দ্রুত ও বিস্তৃত এলাকায় কৌশলগত আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান হাতিয়ার।  
ফ্লাইট ডেকে কর্মরত নাবিকদের জন্য এটি কোনো সাধারণ মহড়া নয়, বরং সার্বক্ষণিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার সমতুল্য। যেকোনো মুহূর্তে জরুরি নির্দেশ আসার সাথে সাথে যাতে বিমানগুলো মিশন নিয়ে আকাশে উড়তে পারে, সেজন্য ২৪ ঘণ্টাই কড়া পাহারা ও কার্যক্রম বজায় রাখা হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর এই কঠোর প্রস্তুতি স্পষ্ট করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান ও কৌশলগত প্রভাব রক্ষা করতে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর