রাশিয়ার নতুন হামলা কৌশলে ইউক্রেনে বাড়ছে আতঙ্ক ও দুর্ভোগ
রাশিয়ার নতুন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনজুড়ে বাড়ছে আতঙ্ক। ঘুম, কাজ, যাতায়াত—সবকিছুতেই যুদ্ধের ছায়া। দীর্ঘ হামলায় সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরও অনিশ্চিত, বিপজ্জনক ও দুর্বিষহ।
রাশিয়ার নতুন হামলা কৌশলে ইউক্রেনে বাড়ছে আতঙ্ক ও দুর্ভোগ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি নতুন করে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা বাড়ার পাশাপাশি হামলার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। দিন-রাত যেকোনো সময় দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলার সতর্কতা জারি হওয়ায় কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কিয়েভের একটি শপিং সেন্টারের বেসমেন্টে কাজ করেন ৪২ বছর বয়সী ওলেনা ক্রাকোভস্কা। সেখানে থাকলে বিমান হামলার সময় তিনি অনেকটাই নিরাপদ বোধ করেন। কিন্তু বাড়িতে থাকলে সাইরেন, বিস্ফোরণের শব্দ ও আকাশে ড্রোন ধ্বংসের দৃশ্য তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। তার ভাষায়, সাম্প্রতিক সময়ে হামলা এত বেড়েছে যে মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া এখন এমন একটি কৌশল অনুসরণ করছে যার মাধ্যমে ইউক্রেনের শহর ও গ্রামগুলোতে মানুষের ওপর আরও বেশি চাপ ও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। আগস্টের শেষ দিকে বিমান হামলার সতর্কতার সংখ্যা এবং স্থায়িত্ব দ্রুত বেড়ে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। জুন থেকে আগস্টের শুরুর দিকে যেখানে সপ্তাহে গড়ে প্রায় পাঁচটি সতর্কতা জারি হতো, আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে তা বেড়ে ১২টি এবং চতুর্থ সপ্তাহে ৩৪টিতে পৌঁছে।
রাশিয়ার হামলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে জেটচালিত ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়া প্রায় ২ হাজার ৮০০টি জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করেছে। জুনে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫০ এবং জুলাইয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০। দ্রুতগতির এসব ড্রোন ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
হামলার প্রভাব এখন শুধু সামরিক স্থাপনা বা যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। বিমান হামলার সতর্কতা জারি হলে কিয়েভের মেট্রো ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে, রাস্তায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় এবং মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়। অনেক দোকান ও সুপারমার্কেটও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে খাবার কেনাকাটা থেকে শুরু করে কর্মস্থলে যাওয়া—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পর অনেক সময় স্কুলে ক্লাস চলার মধ্যেই বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠছে। তখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হচ্ছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
৮ সেপ্টেম্বর কিয়েভে নতুন করে বড় ধরনের রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। কয়েক দিনের তুলনামূলক বিরতির পর চালানো ওই হামলায় হতাহতের পাশাপাশি আবাসিক ভবন, স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পরদিনও ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যায়।
ইউক্রেনের জন্য সামনে আরও বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে শীতকাল। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে শীতের সময় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এ কারণে ইউক্রেন তার মিত্রদের কাছ থেকে আরও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা চাচ্ছে।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলার নতুন ধরন ইউক্রেনের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ঘুম, কাজ, যাতায়াত, কেনাকাটা কিংবা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন বিমান হামলার আশঙ্কা জড়িয়ে গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের জীবনেও এই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।