শিক্ষককে থানায় দেওয়ার ক্ষোভে কিশোরদের ধারালো অস্ত্রের ভয়ংকর হামলা
শিক্ষার্থীকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে এবার নিজেই হামলার শিকার শিক্ষক! ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত নজরুল ইসলাম—কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে উঠেছে প্রশ্ন।
শিক্ষককে থানায় দেওয়ার ক্ষোভে কিশোরদের ধারালো অস্ত্রের ভয়ংকর হামলা
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় এক স্কুলশিক্ষকের ওপর কয়েকজন কিশোরের ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আমিরাবাদ ইউনিয়নের শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়কে হামলার শিকার হন ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চবিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম (৩৫)। ওই সময় তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক শুনে ফিরে তাকাতেই কয়েকজন কিশোর অস্ত্র হাতে তাঁকে ঘিরে ফেলে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীদের একজন শিক্ষক নজরুলকে উদ্দেশ করে বলে, ‘তুই আমাকে থানায় দিলি কেন?’ এরপরই ছুরি ও ক্ষুর দিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। একের পর এক আঘাতে তাঁর দুই হাত, ডান পায়ের ঊরুসহ শরীরের অন্তত পাঁচটি স্থানে জখম হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নজরুল ইসলাম চিৎকার করলে হামলাকারীরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা প্রায় ৪৫ হাজার টাকা ও মুঠোফোনও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার জেরে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২২ আগস্ট বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে তার সাবেক সহপাঠীর নেতৃত্বে কয়েকজন কিশোর তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে শিক্ষকরা বটতলী স্টেশনের কাঁচাবাজার এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক কিশোরকে পুলিশে দেওয়া হয়। সে ওই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং এর আগে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিনের দাবি, ওই ঘটনার পর থেকেই শিক্ষক নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হামলার সঙ্গে আগের ঘটনার যোগসূত্র তদন্তের বিষয়। শিক্ষকরা একজন শিক্ষার্থীকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে যদি নিজেরাই হামলার শিকার হন, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হামলার পর থেকে নজরুল ইসলাম শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। শরীরের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, ফলে কর্মস্থলেও ফিরতে পারেননি তিনি। নিজেরই ছাত্রের বয়সী কিশোরদের হাতে এমন হামলার শিকার হওয়া তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা একজন শিক্ষক কখনো ভাবেননি যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকেই এভাবে আক্রান্ত হতে হবে।
ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে স্থানীয় প্রশাসনও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিবার, বিদ্যালয়, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িতদের পরিচয় যাই হোক, তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
এ ঘটনায় শিক্ষক নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে লোহাগাড়া থানায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। পুলিশ ইতোমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং হামলায় জড়িত অন্যদেরও শনাক্ত করা হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একজন শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা নয়; বরং কিশোরদের হাতে সহিংসতা ও ধারালো অস্ত্র পৌঁছে যাওয়ার ভয়াবহ বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। যে বয়সে কিশোরদের হাতে থাকার কথা বই-খাতা কিংবা খেলাধুলার সামগ্রী, সেই বয়সে কেন তারা অস্ত্র হাতে নিচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুরো সমাজের সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।