ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা, পশ্চিম এশিয়ায় ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ আশঙ্কা প্যানেটার

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত দ্রুত শেষ না হলে পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, অস্থিরতা ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা, পশ্চিম এশিয়ায় ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ আশঙ্কা প্যানেটার

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা, পশ্চিম এশিয়ায় ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ আশঙ্কা প্যানেটার


ইরান যুদ্ধ আরও ছয় মাস গড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন লিওন প্যানেটা; তাঁর আশঙ্কা, সংঘাতটি মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়ে পশ্চিম এশিয়ায় আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক পরিচালক লিওন প্যানেটা।

রোববার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে প্যানেটা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে এমন এক ভয়াবহ অচলাবস্থায় আটকে আছে, যেখান থেকে যুদ্ধ শেষ করার কার্যকর পথ খুব সীমিত। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সংঘাতটি আরও অন্তত ছয় মাস চলতে পারে। 

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন সামরিক অভিযান নয়; বরং কীভাবে এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র বের হয়ে আসবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তাঁর ভাষায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন একটি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার জন্য কার্যকর সমঝোতার পথ স্পষ্ট নয়।

সাবেক এই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হতে পারে। তিনি এটিকে পশ্চিম এশিয়ায় আরেকটি ‘ব্যর্থ যুদ্ধ’ এবং ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।

প্যানেটার বিশ্লেষণে, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন কয়েকটি কঠিন বিকল্প রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিক অভিযান কমিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, কিন্তু এতে রাজনৈতিকভাবে পরাজয়ের অভিযোগ উঠতে পারে। আবার বর্তমান সামরিক চাপ অব্যাহত রাখলেও দ্রুত বিজয়ের নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইতোমধ্যে উত্তেজনা তীব্র। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও নৌচাপ ইরানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তেল রপ্তানি কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আমদানিতে বাধার কারণে ইরানের অর্থনীতি কঠিন চাপে রয়েছে।

তবে অর্থনৈতিক চাপের মুখেও ইরান পিছু হটার সংকেত দেয়নি। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে হামলা হলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তেহরান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছে।হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, তেলের দাম, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে। ইতোমধ্যে জলপথটিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

এদিকে মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে না। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন পারমাণবিক চুক্তির সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে।

তবে প্যানেটার মন্তব্যের সব অংশের সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একমত নয়। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, প্রতিরক্ষা দপ্তরে বিশৃঙ্খলা রয়েছে—এমন ধারণা ভিত্তিহীন এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী পূর্ণ সক্ষমতায় দায়িত্ব পালন করছে। 

এর মধ্যেই যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক বাড়ছে। সংঘাত ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও স্থায়ী সমাধান না আসায় ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সাম্প্রতিক সময়ে এটিকে ‘যুদ্ধ’ না বলে সামরিক সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যদিও বাস্তবে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

প্যানেটার সতর্কবার্তার মূল বিষয় হলো, সামরিক অভিযান শুরু করা এবং একটি যুদ্ধ সফলভাবে শেষ করা এক বিষয় নয়। তাঁর আশঙ্কা, স্পষ্ট রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সংঘাতে আটকে যেতে পারে, যার শেষ নির্ধারণ করা কঠিন হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই ওয়াশিংটনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখেও কীভাবে সংঘাতকে আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকানো যায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখাও এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

প্যানেটার আশঙ্কা সত্যি হলে ইরান যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘাত হিসেবে থাকবে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর