দৃষ্টিহীন ও বধির বলে যাকে চিকিৎসক হতে মানা করা হয়েছিল, তিনিই গড়লেন ইতিহাস

দৃষ্টিহীনতা ও শ্রবণপ্রতিবন্ধকতার বাধা পেরিয়ে আলেকজান্দ্রা অ্যাডামস চিকিৎসক হয়ে যুক্তরাজ্যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

দৃষ্টিহীন ও বধির বলে যাকে চিকিৎসক হতে মানা করা হয়েছিল, তিনিই গড়লেন ইতিহাস

দৃষ্টিহীন ও বধির বলে যাকে চিকিৎসক হতে মানা করা হয়েছিল, তিনিই গড়লেন ইতিহাস


দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির প্রতিবন্ধকতা থাকায় একসময় আলেকজান্দ্রা অ্যাডামসকে বলা হয়েছিল, তিনি কখনো চিকিৎসক হতে পারবেন না। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দীর্ঘ সংগ্রামের পর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি।

আলেকজান্দ্রা জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির গুরুতর সমস্যার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার জীবনে একের পর এক বাধা তৈরি করলেও তিনি কখনো নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি।

চিকিৎসক হওয়ার অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে। কৈশোরে পেটের অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তাকে প্রায় ১৭ মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে তার প্রায় ২০টি অস্ত্রোপচার হয়।

হাসপাতালে দীর্ঘদিন রোগী হিসেবে থাকার সময় তিনি উপলব্ধি করেন, প্রতিবন্ধী রোগীদের কথা ও প্রয়োজন অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। চিকিৎসকদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তার মনে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভবিষ্যতে এমন একজন চিকিৎসক হবেন, যিনি রোগীর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি তার কথা ও অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেবেন। এরপর তিনি কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে শুরু করেন। তবে পড়াশোনার পথও সহজ ছিল না। দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে তাকে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিজের জন্য বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়েছে।

হৃদ্‌স্পন্দন শোনার জন্য তিনি বিশেষ ধরনের তারবিহীন শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে রোগীর হৃদ্‌যন্ত্রের স্পন্দনের শব্দ তার শ্রবণযন্ত্রে পৌঁছে যায়। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি চিকিৎসা শিক্ষার বিভিন্ন ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেন।

চিকিৎসা প্রশিক্ষণের সময়ও তাকে নানা ধরনের বাধা ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কেউ কেউ তার শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা তাকে পিছিয়ে দেয়নি। বরং তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তির সীমাবদ্ধতা তার মেধা, দায়িত্ববোধ কিংবা মানুষের সেবা করার ক্ষমতাকে নির্ধারণ করে না।

আলেকজান্দ্রার ঘটনা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কয়েক বছর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে যুক্তরাজ্যের প্রথম দৃষ্টিহীন ও বধির চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ তখন তিনি চিকিৎসক হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, এখনো চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেননি।

পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী চিকিৎসা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম দৃষ্টিহীন ও বধির চিকিৎসক হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এটি প্রতিবন্ধী মানুষের সক্ষমতা ও সমান সুযোগের প্রয়োজনীয়তারও একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

একসময় যে মানুষটিকে বলা হয়েছিল, তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের পথে বাধা হবে, শেষ পর্যন্ত তিনিই সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, অসংখ্য অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘ হাসপাতালজীবনের কষ্ট পেরিয়ে আলেকজান্দ্রা অ্যাডামস চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর