কাতারে হামলার কথা স্বীকার নেতানিয়াহুর, দোহা হামলা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা
কাতারে ইসরায়েলি হামলার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু। দোহায় হামলার এক বছর পূর্তির আগে তাঁর মন্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক উত্তেজনা।
কাতারে হামলার কথা স্বীকার নেতানিয়াহুর, দোহা হামলা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা
কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার প্রায় এক বছর পর সেই অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি কাতারে হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেন। একই সঙ্গে কাতারকে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে গাজা যুদ্ধের সময় দেশটির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি কাতারে হামলা করেছেন এবং সেখানে বোমা হামলাও চালানো হয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় কাতারের ওপর হামলা চালানোর কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, কাতারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি পরে নেতানিয়াহু নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁর এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন দোহায় ইসরায়েলি হামলার প্রথম বার্ষিকী ঘনিয়ে এসেছে।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়। হামলার সময় হামাসের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি মুক্তির বিষয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্য করেই অভিযানটি চালানো হয়।
তবে ওই হামলার পর হামাস জানায়, তাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাকারী নেতারা হামলা থেকে বেঁচে গেছেন। হামলায় হামাসের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পাশাপাশি কাতারের একজন নিরাপত্তাকর্মীও নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। কাতারের রাজধানীতে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
দোহা তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। কাতারের কর্মকর্তারা এটিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন। কাতার আরও অভিযোগ করে, যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যেই হামলা চালিয়ে ইসরায়েল শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও দোহায় ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেন। তিনি হামলাটিকে কাতারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশও কাতারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এবং দোহায় হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানায়।
গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই কাতার ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুদ্ধবিরতি, জিম্মি মুক্তি এবং মানবিক সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন দফায় আলোচনায় কাতার যুক্ত ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন সংকটে কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত।
কাতারে হামাসের রাজনৈতিক কার্যালয়ও দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। কাতারের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দোহায় অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি আলোচনার একটি কূটনৈতিক চ্যানেল বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল।
দোহায় হামলার পর ইসরায়েল ও কাতারের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়, কারণ কাতার ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার এবং গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে আসছিল। হামলার ঘটনাটি তাই শুধু ইসরায়েল ও কাতারের দ্বিপক্ষীয় বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে নেতানিয়াহু কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং দোহায় হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসে। ওই সময় ভবিষ্যতে কাতারের ভূখণ্ডে এ ধরনের হামলা না হওয়ার আশ্বাস দেওয়ার কথাও জানা যায়। ফলে প্রায় এক বছর পর নেতানিয়াহুর নিজের মুখে কাতারে হামলার বিষয়ে নতুন করে মন্তব্য করা বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু কাতার থেকে গাজায় যাওয়া অর্থ নিয়েও কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গাজায় কাতারের আর্থিক সহায়তা মানবিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্যই দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোরও মতামত ছিল। তবে কাতারের অর্থায়ন নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকেরা অভিযোগ করে আসছেন, গাজায় প্রবেশ করা অর্থ হামাসের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতে পারে; যদিও কাতার এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্যের কারণে ২০২৫ সালের দোহা হামলা আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিশেষ করে কাতার যখন গাজা সংঘাতের অবসান এবং যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশটির ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দোহায় হামলার প্রায় এক বছর পর নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য তাই শুধু অতীতের একটি সামরিক অভিযানের স্বীকারোক্তি হিসেবে নয়, বরং ইসরায়েল-কাতার সম্পর্ক, গাজা যুদ্ধের কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।