ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, বাড়ছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সক্ষমতা
ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন, বাড়বে তেল পরিশোধন সক্ষমতা। কমতে পারে আমদানিনির্ভরতা, শক্তিশালী হবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতি।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, বাড়ছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সক্ষমতা
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথ খুলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে অর্থায়ন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মিজানুর রহমান এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রায় ১ হাজার ৪ দশমিক ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করবে। অর্থাৎ অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অর্থায়ন প্রকল্পটির বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির জন্য এই অর্থায়ন অনুমোদন করে।
প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নতুন একটি বড় পরিশোধন ইউনিট স্থাপন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি হবে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে মোট পরিশোধন ক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে।
এই সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ দেশীয়ভাবে পরিশোধনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়লে দেশে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে সেটিকে স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের সুযোগ বাড়বে। এর ফলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু করা এই রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু দেশের জনসংখ্যা, শিল্পায়ন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান পরিশোধন সক্ষমতা অনেকটাই অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে।
দেশে প্রতিবছর জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়লেও স্থানীয়ভাবে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। ফলে প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে এসব আমদানিতে দেশের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ সেই চাপ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় পরিশোধন সক্ষমতা বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ বর্তমানে যেসব পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য বিদেশ থেকে কিনতে হয়, তার একটি অংশ ভবিষ্যতে দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে আমদানি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, বিটুমিনসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদন করা হয়। নতুন পরিশোধন সক্ষমতা যুক্ত হলে এসব পণ্যের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো কারণে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে কিংবা বৈশ্বিক সংকটের কারণে আমদানি কঠিন হয়ে পড়লে স্থানীয় পরিশোধন সক্ষমতা একটি দেশের জন্য বড় সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে সেই সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে বহু বছর ধরেই রিফাইনারিটির সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পের ব্যয়, অর্থায়ন, কারিগরি বিষয় এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে নানা জটিলতার কারণে কাজটি প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এবার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বড় অঙ্কের অর্থায়ন চুক্তি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইস্টার্ন রিফাইনারির বাড়তি সক্ষমতা দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারে।
তবে বড় এই প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল পেতে হলে শুধু অর্থায়ন নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন স্থাপনার কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বর্তমানের প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। এতে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার বড় একটি অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে, কমতে পারে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং শক্তিশালী হতে পারে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।