২০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি গরমিল: হিসাবের ভুল নাকি অর্থ পাচারের ফাঁদ?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে পণ্য আমদানি ব্যয় আগের অর্থবছরের প্রায় ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার

২০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি গরমিল: হিসাবের ভুল নাকি অর্থ পাচারের ফাঁদ?

২০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি গরমিল: হিসাবের ভুল নাকি অর্থ পাচারের ফাঁদ?


২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির হিসাব নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পার্থক্য সামনে আসায় অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এত বড় ব্যবধানের কারণ কী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, এই অর্থের পুরোটাই অর্থ পাচার হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত না হলে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের পণ্য আমদানির পরিমাণ প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে একই সময়ে আমদানি ব্যয় প্রায় ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মধ্যে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের গরমিলের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে পণ্য আমদানি ব্যয় আগের অর্থবছরের প্রায় ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচারের সম্ভাবনা। আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে বিদেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো অথবা কম মূল্য দেখিয়ে শুল্ক ও কর ফাঁকি দেওয়ার মতো অনিয়মকে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের সম্ভাব্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আমদানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা এবং পণ্যের মূল্য বেশি বা কম দেখানোর ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি অবৈধভাবে দেশের অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রেও বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিভিন্ন পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে আমদানি পণ্যের মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ব্যবস্থাপনার একটি গবেষণার বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্য-সংক্রান্ত মূল্য কারসাজির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা প্রতিবেদনে সম্ভাব্য অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ বছরে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে এসব অনুমানকে নির্দিষ্ট কোনো অর্থবছরের আমদানি হিসাবে পাওয়া গরমিলের সমান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি হিসাবের এই বড় পার্থক্যের পেছনে তথ্য সংগ্রহের সময়কাল, হিসাব পদ্ধতি, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ এবং তথ্য সমন্বয়ের মতো স্বাভাবিক কারণও থাকতে পারে। তাই তদন্তের আগে পুরো অর্থকে পাচার হওয়া অর্থ হিসেবে চিহ্নিত করা সঠিক হবে না।

তবে এত বড় পার্থক্যের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, আমদানি ব্যয় এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের তথ্য সমন্বয় করে একটি স্বাধীন নিরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের আমদানি চালানের মূল্য, ঋণপত্র, ব্যাংক থেকে পরিশোধিত অর্থ এবং রপ্তানিকারক দেশের ঘোষিত মূল্যের মধ্যে মিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

২০ বিলিয়ন ডলারের গরমিলকে সরাসরি ২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ পাচার বলা যাবে না। তবে এত বড় তথ্যগত অসামঞ্জস্যের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও যাচাই এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর