কর্মজীবী বাবা-মায়ের তহবিল থেকে ঘরে থাকা অভিভাবকদের ভর্তুকি দিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন

ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি নীতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যার আওতায় বিবাহিত দম্পতিদের একজন বাইরে কাজ করলে এবং অন্যজন বাড়িতে থেকে সন্তান লালন-পালন করলে তারাও সরকারি শিশু যত্ন ভর্তুকি পেতে পারেন

কর্মজীবী বাবা-মায়ের তহবিল থেকে ঘরে থাকা অভিভাবকদের ভর্তুকি দিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন

কর্মজীবী বাবা-মায়ের তহবিল থেকে ঘরে থাকা অভিভাবকদের ভর্তুকি দিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন


ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি নীতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যার আওতায় বিবাহিত দম্পতিদের একজন বাইরে কাজ করলে এবং অন্যজন বাড়িতে থেকে সন্তান লালন-পালন করলে তারাও সরকারি শিশু যত্ন ভর্তুকি পেতে পারেন।

এই নীতি কার্যকর হলে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার বাবা-মাকে বাড়িতে থেকে সন্তান লালন-পালনের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেবে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন পরিবার ও সন্তান লালন-পালনে প্রচলিত রক্ষণশীল ধারণাকে সরকারি অর্থের মাধ্যমে উৎসাহিত করতে চাইছে।

এ জন্য স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের একটি তহবিল ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তহবিলটি মূলত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মজীবী বাবা-মাকে শিশুদের দেখাশোনার খরচ বহনে সহায়তা করার জন্য ১৯৯০-এর দশকে চালু করা হয়েছিল।

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ঘরে থেকে সন্তান লালন-পালনকারী বাবা বা মা সাধারণত প্রতি শিশুর জন্য বছরে প্রায় ৯ হাজার ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারেন। এতে সরকারি শিশু যত্নের অর্থ কোন পরিবারগুলো পাবে, তার কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন নীতির ফলে কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ ঘরে থাকা বাবা-মায়ের কাছে চলে যেতে পারে। এতে শিশু যত্ন কেন্দ্রগুলোর আয় কমে যেতে পারে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানকে সেবার মূল্য বাড়ানো অথবা কার্যক্রম বন্ধ করতে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান শিশু যত্ন সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিশু যত্ন ভর্তুকি পাওয়া প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার পরিবারের ৮০ শতাংশই একক কর্মজীবী অভিভাবকের পরিবার। তাদের অধিকাংশই মা। নতুন নীতি চালু হলে এসব পরিবারের সঙ্গে একই সরকারি অর্থের জন্য নতুন একটি শ্রেণির পরিবার প্রতিযোগিতায় যুক্ত হবে।

প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আয়সীমার মধ্যে থাকা বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে একজন বাড়িতে থেকে সন্তান দেখাশোনা করলে এবং অন্যজন সপ্তাহে অন্তত ৩৫ ঘণ্টা কাজ করলে তারা এই সুবিধা পেতে পারেন। অর্থটি মূলত বাড়িতে থাকা অভিভাবকের হারানো আয়ের একটি অংশ পূরণ করতে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

তবে অবিবাহিত দম্পতি, যাদের একজন বাড়িতে থেকে সন্তান দেখাশোনা করেন, এই সুবিধার আওতায় থাকবেন না। একইভাবে বর্তমানে কর্মরত নন এমন একক অভিভাবকরাও নতুন ব্যবস্থায় এই ভর্তুকি পাবেন না।

প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। হোয়াইট হাউসের অনুমোদনের পর এটি জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হবে। চূড়ান্ত হলে আগামী বছর থেকেই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে পারে।

প্রশাসনের কিছু আইনজীবী এরই মধ্যে প্রস্তাবটির আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে শুধু বিবাহিত দম্পতিদের এই সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন। একই সঙ্গে ব্যক্তিদের সরাসরি অর্থ দেওয়ার ফলে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও উদ্বেগ রয়েছে।

জেডি ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরে সন্তানদের আরও বেশি সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। ২০২১ সালে তিনি একটি মতামত নিবন্ধে যুক্তি দিয়েছিলেন, ছোট শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকলে বেশি সুখী ও সুস্থ থাকে।

রক্ষণশীল সংগঠন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের তৈরি রক্ষণশীল নীতির রূপরেখাতেও ঘরে থাকা বাবা-মাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে সবার জন্য সরকারি শিশু দিবাযত্নের পরিবর্তে বাবা-মাকে বাড়িতে থেকে সন্তান দেখাশোনার খরচ মেটাতে অর্থ দেওয়ার কথা বলা হয়।

তবে পরিবারনীতি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সতর্ক করেছে, নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না বাড়িয়ে একই তহবিলের আওতা বাড়ানো হলে কর্মজীবী অভিভাবকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

নীতিবিষয়ক গবেষক প্যাট্রিক টি. ব্রাউন বলেন, তিনি ঘরে থাকা বাবা-মায়ের জন্য আরও সহায়তার পক্ষে হলেও বিদ্যমান তহবিল ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে তা করা সমর্থন করেন না। তাঁর মতে, একই অর্থের জন্য আরও বেশি বাবা-মা প্রতিযোগিতা করলে বিশেষ করে একক কর্মজীবী অভিভাবকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের এই সরকারি তহবিল বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ শিশুর শিশু যত্নের খরচে সহায়তা করছে। অর্থের বড় অংশ অঙ্গরাজ্যগুলোর মাধ্যমে ভাউচার অথবা শিশু যত্ন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, অভিভাবকদের আয় সাধারণত তাদের অঙ্গরাজ্যের মধ্যম আয়ের ৮৫ শতাংশের নিচে হতে হয়। পাশাপাশি তাদের কাজ, পড়াশোনা অথবা কর্মপ্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। কিছু অঙ্গরাজ্যে এই আয়সীমা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কম।

শিশু যত্ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কিছু অঙ্গরাজ্যে নতুন নিয়ম চালু হলে সরকারি অর্থের বড় অংশ ঘরে থাকা বাবা-মায়ের কাছে চলে যেতে পারে। এতে ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার শিশু যত্ন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।

কলোরাডোর অরোরার একটি শিশু যত্ন কেন্দ্রের মালিক ক্রিস্টাল গ্যাস্টিনো বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে যত্ন নেওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেকই সরকারি ভর্তুকির আওতায় রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, অভিভাবকরা যদি ওই অর্থ নিয়ে সন্তানকে নিজেরাই বাড়িতে রাখার সুযোগ পান, তাহলে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বড় একটি আয়ের উৎস হারিয়ে যাবে।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের একক অভিভাবক লেজলি ক্র্যানস্টন বলেন, সরকারি ভর্তুকি তাঁর সন্তানদের যত্নের খরচ বহনে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ব্যাপক সহায়তা করেছে। তাঁর আশঙ্কা, নতুন নিয়ম চালু হলে কর্মজীবী ও একক অভিভাবকদের মধ্যে ভর্তুকি পাওয়ার প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ফলে প্রস্তাবটি একদিকে ঘরে থেকে সন্তান লালন-পালনকে উৎসাহিত করার রক্ষণশীল পারিবারিক নীতি, অন্যদিকে কর্মজীবী ও একক অভিভাবকদের বিদ্যমান শিশু যত্ন সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা—এই দুইয়ের মধ্যে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর