আগস্টে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ২২ শতাংশ বেড়েছে, অর্থনীতিতে মিলছে নতুন স্বস্তির ইঙ্গিত
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে আগস্টে বড় প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়লেও টানা তৃতীয় মাসে তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি।
আগস্টে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ২২ শতাংশ বেড়েছে, অর্থনীতিতে মিলছে নতুন স্বস্তির ইঙ্গিত
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে। ২০২৬ সালের আগস্টে দেশে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। তবে প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ তিন বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক সংকেত তৈরি হলেও এটিকে এককভাবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে, আগস্টে প্রবাসী আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। তবে আগস্টে মোট প্রবাহ তিন বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল এবং এটি টানা তৃতীয় মাস, যখন মাসিক রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেনি।
বাংলাদেশের মতো বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের পরিবারগুলো সরাসরি উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে। এর ফলে আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক লেনদেন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছিল। ডলারের মূল্য, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—সবকিছুর ওপরই রেমিট্যান্সের প্রবাহের প্রভাব রয়েছে। তাই প্রবাসী আয় বাড়লে অর্থনীতির জন্য সেটি সাধারণত ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে আগস্টের পরিসংখ্যানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রবৃদ্ধি থাকলেও মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ তিন বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। ফলে শুধু শতাংশের প্রবৃদ্ধি দেখে পরিস্থিতিকে অতিরিক্ত ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন না করে মোট প্রবাহ, আগের মাসগুলোর ধারাবাহিকতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এর বাস্তব প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এর আগে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ প্রায় ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছিল। ওই প্রবাহ আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি ছিল।
অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারাটি দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ের পর আগস্টেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে এটি আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও বড় বিষয় হলো, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয় ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল বলে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে। তবে ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার বিপরীতে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাসী আয় বেড়েছিল।
এই তথ্য বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের উৎসে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের ওপর বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় নির্ভরতা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো অর্থের প্রবাহ বাড়ায় উৎসের বৈচিত্র্য কিছুটা বাড়ছে।
রেমিট্যান্স বাড়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করতে পারে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, প্রবাসীদের আয় বৃদ্ধি, বিনিময় হার এবং আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা—এসব কারণ রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আগস্টের নির্দিষ্ট ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পেছনে কোন কারণ কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা আলাদা করে নিশ্চিত করার জন্য আরও বিশদ বাংলাদেশ ব্যাংকীয় তথ্য প্রয়োজন।
প্রবাসী আয়ের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি দেশের সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিদেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশি যখন দেশে টাকা পাঠান, সেই অর্থ দিয়ে পরিবারের সদস্যরা খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটান। অনেক পরিবার আবার রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে জমি, বাড়ি, ছোট ব্যবসা বা কৃষিতে বিনিয়োগ করে।
তবে রেমিট্যান্স বাড়লেও দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাত একই সঙ্গে শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয়। রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব আদায়—সবগুলো ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে ছিল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য কম বলে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য রপ্তানি ও উৎপাদনশীল খাতের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে লেনদেন আরও স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ করতে নতুন উদ্যোগও নিয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট বা এফএক্সএম মডিউল চালু করেছে, যার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ এবং আন্তঃব্যাংক লেনদেনের প্রক্রিয়া আরও স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে এ ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা বাজার ব্যবস্থাপনায়ও সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে ডলারের সরবরাহ, আমদানি চাহিদা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ—সবকিছুর ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।