স্মিথসোনিয়ানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন চাপ, ফেডারেল সহায়তা বন্ধের হুমকি ঘিরে বিতর্ক
স্মিথসোনিয়ানের বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করে ফেডারেল সহায়তা কমানোর হুমকি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, ইতিহাস উপস্থাপন নিয়ে ওয়াশিংটনে বিতর্ক তীব্র।
স্মিথসোনিয়ানের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন চাপ, ফেডারেল সহায়তা বন্ধের হুমকি ঘিরে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠান স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ফেডারেল সংস্থাগুলোকে স্মিথসোনিয়ানের সঙ্গে সহযোগিতা কমানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়ে প্রশাসনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশাসনের অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম এবং হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ নীতিবিষয়ক কাউন্সিলের পরিচালক ভিন্স হ্যালি স্মিথসোনিয়ানের পরিচালনা পর্ষদকে চিঠিটি পাঠান। সেখানে তারা বলেছেন, বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে স্মিথসোনিয়ানের কার্যক্রমকে সমর্থন করতে ফেডারেল সংস্থাগুলোর পক্ষে অসুবিধা রয়েছে। বিশেষ করে প্রদর্শনীর জন্য নিদর্শন ধার দেওয়া, সংগ্রহ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা এবং কিছু বিবেচনামূলক অনুদানের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান। ওয়াশিংটন ডিসিতে এর একাধিক জাদুঘর রয়েছে এবং বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস, শিল্প, বিজ্ঞান, মহাকাশ, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে এর বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ওপর ফেডারেল সরকারের চাপ শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি ইতিহাস ও সংস্কৃতি কীভাবে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করা হবে—সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষের অন্যতম বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথার ইতিহাস কীভাবে স্মিথসোনিয়ানের প্রদর্শনী ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ট্রাম্প এর আগে অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি আমেরিকার ইতিহাসের নেতিবাচক দিক, বিশেষ করে দাসপ্রথার ভয়াবহতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। প্রশাসনের মতে, দেশের ইতিহাসকে আরও ইতিবাচক ও ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
এই অবস্থানের বিরোধীরা বলছেন, ইতিহাসের কঠিন ও অস্বস্তিকর অধ্যায় লুকিয়ে বা কম গুরুত্ব দিয়ে দেখানো কোনোভাবেই ইতিহাসের নিরপেক্ষ উপস্থাপন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথা, বর্ণবৈষম্য এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলন দেশটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাদুঘরের দায়িত্ব হলো প্রমাণ ও গবেষণার ভিত্তিতে এসব বিষয় মানুষের সামনে তুলে ধরা—এমনটাই তাদের যুক্তি।
স্মিথসোনিয়ান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রম এবং প্রদর্শনী নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে আমেরিকার ইতিহাসে দাসপ্রথা ও বর্ণবৈষম্যের ভূমিকা নিয়ে প্রদর্শনীগুলো প্রশাসনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
নতুন চিঠিতে সরাসরি স্মিথসোনিয়ানের ফেডারেল অর্থায়ন সম্পূর্ণ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং ফেডারেল সংস্থাগুলোর বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো প্রদর্শনীর জন্য সরকারি সংগ্রহ থেকে নিদর্শন ধার দেওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে। গবেষণা ও প্রদর্শনী পরিচালনায় এ ধরনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে।
স্মিথসোনিয়ানের অর্থায়নের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি ফেডারেল সরকারের কাছ থেকে অর্থ পায় এবং একই সঙ্গে বেসরকারি দাতা, অনুদান ও অন্যান্য উৎস থেকেও সহায়তা পেয়ে থাকে। ফলে ফেডারেল সহযোগিতা কমে গেলে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে বড় আকারের গবেষণা, সংগ্রহ সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনী কার্যক্রমে সরকারি সহযোগিতা কমে গেলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান মার্কিন রাজনীতিতে শিক্ষা, ইতিহাস, বর্ণ, পরিচয় ও সংস্কৃতির উপস্থাপন নিয়ে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করছে যেগুলো তাদের মতে আমেরিকার ইতিহাসের নেতিবাচক বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। স্মিথসোনিয়ান সেই বিতর্কের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশের যুক্তি হলো, একটি দেশের ইতিহাস শুধু বিজয়, সাফল্য ও ইতিবাচক অর্জনের ইতিহাস নয়। দাসপ্রথা, গৃহযুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং সামাজিক সংঘাতও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাদুঘরের কাজ হলো দর্শকদের সামনে সেই জটিল ইতিহাসকে প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরা, যাতে মানুষ অতীতকে বুঝে বর্তমান সমাজকে আরও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে।
স্মিথসোনিয়ানের ওপর চাপের ফলে জাদুঘরের প্রদর্শনীগুলোতে ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রশাসন যদি ফেডারেল সহায়তা বা সরকারি নিদর্শন ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে, তাহলে কিছু প্রদর্শনী নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই বিরোধের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দিকও রয়েছে। স্মিথসোনিয়ান একটি বিশেষ কাঠামোর প্রতিষ্ঠান এবং এর নিজস্ব পরিচালনা ব্যবস্থা রয়েছে। ফেডারেল সরকার অর্থায়ন ও সরকারি সম্পদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু একটি জাদুঘরের গবেষণা ও প্রদর্শনীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সীমা কোথায়—এ নিয়ে ভবিষ্যতে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ নতুন নয়। তবে স্মিথসোনিয়ানের মতো এত বড় এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিতর্কের প্রভাব অনেক বেশি। কারণ এর জাদুঘরগুলো প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রদর্শনীতে পরিবর্তন হলে সেই পরিবর্তন শুধু ওয়াশিংটন ডিসির দর্শকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশটির ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশাসনের চিঠিতে ফেডারেল সংস্থাগুলোর সহযোগিতা বন্ধ বা সীমিত করার উদাহরণ হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে—প্রদর্শনীর জন্য নিদর্শন ধার দেওয়া, সংগ্রহ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা এবং বিবেচনামূলক অনুদান। এগুলো থেকে বোঝা যায়, প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করতে চাইছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে স্মিথসোনিয়ানের সব জাদুঘর এখনই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ হচ্ছে। এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বিতর্কটি মূলত ফেডারেল সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎ সহযোগিতা ও প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বের ওপর প্রশাসনের অসন্তোষকে কেন্দ্র করে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি কেউ ‘স্মিথসোনিয়ান বন্ধ হয়ে গেছে’ এমন দাবি করে, সেটি সঠিক হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট তাঁর সমর্থকদের কাছে আমেরিকার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফলে স্মিথসোনিয়ানের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধ তাঁর বৃহত্তর সাংস্কৃতিক নীতির সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে বিরোধীরা আশঙ্কা করছে, রাজনৈতিক প্রশাসন যদি জাদুঘরের ইতিহাস উপস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে গবেষণার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখন নজর থাকবে স্মিথসোনিয়ানের পরিচালনা পর্ষদ কীভাবে এই চিঠির জবাব দেয় এবং ফেডারেল সংস্থাগুলো বাস্তবে সহযোগিতা কমায় কি না। প্রশাসনের হুমকি বাস্তব নীতিতে রূপ নেয় কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিষয়টি আদালতে গড়ালে ফেডারেল অর্থায়ন এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ওপর প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা নিয়েও নতুন আইনি বিতর্ক হতে পারে।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন চাপ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সংস্কৃতির পুরোনো বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নেতৃত্ব এবং ইতিহাস উপস্থাপনের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। সেই অসন্তোষ থেকে ফেডারেল সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কমানোর হুমকি এসেছে।
তবে এখনো স্মিথসোনিয়ানের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি এবং ফেডারেল অর্থায়ন সম্পূর্ণভাবে বাতিলের সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়নি। বর্তমান পর্যায়ে এটি প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ ও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে স্মিথসোনিয়ানের পরিচালনা পর্ষদ, ফেডারেল সংস্থাগুলো এবং প্রয়োজনে আদালতের প্রতিক্রিয়ার ওপর। এই কারণে ঘটনাটিকে ‘স্মিথসোনিয়ান বন্ধ’ হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করাই তথ্যগতভাবে সঠিক।