আশাহীনতার ৯ বছর: বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কেমন আছেন বাংলাদেশের রোহিঙ্গারা?
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নেই কোনো উৎসব বা আশার আলো। নয় বছর ধরে বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গা এখনও অপেক্ষায় নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের। তহবিল সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষা সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে কাটছে তাদের জীবন।
আশাহীনতার ৯ বছর: বিশ্ব শরণার্থী দিবসে কেমন আছেন বাংলাদেশের রোহিঙ্গারা?
কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পের ধূসর ধূলিময় সরু পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন ৪০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ ইসমাইল। আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ক্যাম্পের কিছু এনজিও অফিসে ব্যানার টাঙানো হয়েছে, কিছু আনুষ্ঠানিক আলোচনাও চলছে। কিন্তু ইসমাইলের চোখে এসবের কোনো মূল্য নেই।
"প্রতি বছর এই দিনটি আসে, বিশ্ব আমাদের নিয়ে বড় বড় কথা বলে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না," প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া নিজের ১০ বাই ১০ ফুটের ঝুপড়ি ঘরের দিকে ইশারা করে বলছিলেন ইসমাইল। "নয় বছর ধরে আমরা এই খাঁচায় বন্দি। আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আমাদের সন্তানদের কোনো পরিচয় নেই। আমরা শুধু বেঁচে থাকার জন্য দিন গুনছি।"
ইসমাইলের এই ক্ষোভ ও হতাশা আজ বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রতিটি ঘরের সাধারণ চিত্র। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা এই জনগোষ্ঠী আজ বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বিশ্বরাজনীতির চাকা ঘুরে যাওয়া এবং নতুন নতুন বৈশ্বিক সংকটের (যেমন ইউক্রেন, গাজা ও সুদান সংকট) উত্থানের ফলে রোহিঙ্গা সংকট আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।
১. তহবিল সংকট এবং ক্ষুধার নতুন লড়াই
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে আন্তর্জাতিক সাহায্য বা মানবিক তহবিল কমে যাওয়ার কারণে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো তহবিলের অভাবে গত কয়েক বছরে শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা রেশন বা খাদ্য সহায়তার পরিমাণ কয়েক দফায় কমাতে বাধ্য হয়েছে।
যদিও সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন (১ কোটি ৪০ লাখ) ইউরো অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি একটি স্বস্তি। তবে সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ এখনও অনেক কম। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (JRP) অনুযায়ী প্রায় ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তার আবেদন করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশই এখনও অপূর্ণ।
খাদ্য রেশন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ক্যাম্পের শিশু ও নারীদের ওপর। পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কর্মসংস্থানের কোনো বৈধ সুযোগ না থাকায় রোহিঙ্গারা সম্পূর্ণরূপে এই মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে রেশন কাটার অর্থ হলো তাদের ক্ষুধার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া।
২. ক্যাম্পের ভেতরে নিরাপত্তার চরম অবনতি
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন আর কেবল একটি মানবিক আশ্রয়ের স্থান নয়, বরং এটি দিন দিন অপরাধ চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতরে কাঁটাতারের বেড়ার আড়ালে সক্রিয় রয়েছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মাদক চোরাকারবারি দল। উগ্রপন্থী দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং মাদক পাচারকে কেন্দ্র করে প্রায় রাতেই ক্যাম্পগুলোতে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
বিশেষ করে সাধারণ শরণার্থী, যারা শান্তি চান এবং মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পক্ষে কথা বলেন, তারা এই সশস্ত্র দলগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ক্যাম্পে নিয়োজিত বাংলাদেশের এপিবিএন (Armed Police Battalion) এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত অভিযান চালালেও, ঘনবসতিপূর্ণ এবং ঘিঞ্জি ক্যাম্পগুলোতে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। রাতের বেলা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ মূলত অধরা অপরাধী চক্রের হাতে চলে যায়, যা সাধারণ নারী ও শিশুদের জন্য এক বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি করে।
৩. হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম: শিক্ষা ও কিশোরদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF)-এর তথ্যমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি হলো শিশু। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশু বড় হচ্ছে, যাদের একটি বিশাল অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক ও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। যদিও ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোতে মিয়ানমারের জাতীয় শিক্ষাক্রম (Myanmar Curriculum) অনুযায়ী পাঠদান শুরু হয়েছে, কিন্তু শিক্ষক সংকট, জায়গার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাবে কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ (১৫-১৮ বছর বয়সী) স্কুলছুট হয়ে পড়ছে।
কোনো কাজ বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় এই তরুণ প্রজন্ম চরম হতাশায় ভুগছে। এই দীর্ঘমেয়াদি হতাশাই তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বা মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়তে প্ররোচিত করছে। অনেক তরুণ উন্নত জীবনের আশায় সমুদ্রপথে বিপজ্জনক নৌকায় করে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে, যার ফলে প্রতি বছর শত শত রোহিঙ্গার সলিলসমাধি ঘটছে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে।
৪. প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো ভৌগোলিক কারণেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা এবং পাহাড় ধসের কারণে ক্যাম্পের হাজার হাজার প্লাস্টিক ও বাঁশের ঘর ভেঙে যায়। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর সরাসরি আঘাত আসে এই অরক্ষিত ক্যাম্পগুলোর ওপর।
পাহাড় কেটে তৈরি করা এই ক্যাম্পগুলোতে মাটির ক্ষয়রোধ করার মতো পর্যাপ্ত গাছপালা নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একই সাথে, প্রচণ্ড গরমে এবং অসতর্কতার কারণে প্রায়শই ক্যাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এক একটি অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও ছাই হয়ে যায়।
৫. ভাসানচর প্রকল্প: একটি আংশিক বিকল্প
কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে নোয়াখালীর হাতিয়ায় মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত 'ভাসানচর' দ্বীপে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের জন্য আধুনিক আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছে। সেখানে পাকা বাড়ি, সাইক্লোন শেল্টার এবং জীবনযাত্রার কিছুটা উন্নত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
ইতিমধ্যে বেশ কয়েক হাজার রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় ভাসানচরে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেখানে তাদের মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে এই প্রকল্পটিও কক্সবাজারের মূল সংকটের একটি স্থায়ী বা পূর্ণাঙ্গ সমাধান হতে পারেনি।
৬. স্বাগতিক বাংলাদেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ
প্রায় এক দশক ধরে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বোঝা বহন করতে গিয়ে স্বাগতিক বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং স্থানীয় সমাজ কাঠামোর ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় নাগরিকরা এখন তাদের নিজস্ব এলাকায় সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন।
রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমের মূল্য কমে গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে এবং বনভূমি ধ্বংসের কারণে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলা হচ্ছে যে, এত দীর্ঘ সময় ধরে ১২ লাখ শরণার্থীর ভার এককভাবে বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে আর সম্ভব নয়। বৈশ্বিক সাহায্য কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ সরকার এখন এক কঠিন অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
৭. ভূ-রাজনীতি এবং প্রত্যাবাসনের বন্ধ গলি
রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ, সম্মানজনক এবং টেকসই প্রত্যাবর্তন (Repatriation)। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই সম্ভাবনাকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। মিয়ানমারে সামরিক জান্তা এবং বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (যেমন আরাকান আর্মি) মধ্যে চলমান তীব্র গৃহযুদ্ধের কারণে রাখাইন রাজ্য এখন সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল।
চীন ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এর আগে কয়েকবার পরীক্ষামূলক প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, রাখাইনে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার চললেও, মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্ব বিবেকের কাছে প্রশ্ন
২০২৬ সালের ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবসে জাতিসংঘের মূল প্রতিপাদ্য ও বৈশ্বিক আহ্বানগুলোর মূল কথা হলো বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু কুতুপালং, বালুখালী বা থ্যাংখালীর ক্যাম্পগুলোতে এই বাণীগুলোর কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই।
আজ রোহিঙ্গারা কেবল মিয়ানমার সরকারের দ্বারাই পরিত্যক্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি উদাসীনতারও শিকার। বাংলাদেশ মানবতার খাতিরে তাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি বিশ্বনেতারা এখনই মিয়ানমারের ওপর কঠোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করেন এবং ক্যাম্পগুলোর মানবিক তহবিল সচল না রাখেন, তবে এই ১২ লাখ মানুষের জীবন কেবল অন্ধকারের দিকেই যাবে না, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল টাইম-বোমায় পরিণত হবে।
মোহাম্মদ ইসমাইলের মতো লাখো রোহিঙ্গার একটাই আকুতি—"আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা আমাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে নিজেদের দেশে ফিরতে চাই।" বিশ্ব কি আজ তাদের এই কণ্ঠস্বর শুনবে, নাকি আরও একটি শরণার্থী দিবস কেবল কাগজের বুলি হয়েই পার হয়ে যাবে?