ইউরোপে রেকর্ড তাপদাহে ৫০ হাজারের বেশি মৃত্যুর আশঙ্কা, দুই-তৃতীয়াংশের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন
২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপের ৮৫৪টি শহরে তাপের প্রভাবে আনুমানিক ৫০,৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে, গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ভূমিকা উঠে এসেছে।
ইউরোপে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরে তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১টি অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬১৯টি মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে বলে গবেষকেরা অনুমান করেছেন।
গবেষণাটি ২৩ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছে এবং Nature Health সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকেরা তাপমাত্রার তথ্য, জনসংখ্যার পরিসংখ্যান, ঐতিহাসিক মৃত্যুহার এবং জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে এই হিসাব করেছেন।
ইউরোপে তাপজনিত মৃত্যুর রেকর্ড
গবেষকদের মতে, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ২০২২ সালের আগের রেকর্ডের তুলনায় প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি। ২০২২ সালে একই গবেষকদলের হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের সংশ্লিষ্ট শহরগুলোতে তাপের কারণে প্রায় ২৯ হাজার ৪৮০টি অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটেছিল।
এবারের গ্রীষ্মে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক তাপপ্রবাহ আঘাত হানে। পশ্চিম ইউরোপের বহু এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। কিছু অঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে অনেক ওপরে উঠে যায়। দীর্ঘস্থায়ী গরম এবং রাতেও তাপমাত্রা বেশি থাকায় মানুষের শরীর পর্যাপ্তভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায়নি।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে মোট প্রায় ১৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। এটি ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের সমতুল্য। ফলে গবেষণার হিসাব পুরো ইউরোপের সব শহর, গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা
গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, মোট ৫০ হাজার ৩৯১টি তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর মধ্যে ৩২ হাজার ৬১৯টি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব রয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
এই হিসাব তৈরির জন্য গবেষকেরা বর্তমান বিশ্বের তাপমাত্রার পরিস্থিতির সঙ্গে এমন একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির তুলনা করেছেন, যেখানে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়েনি। দুই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য মৃত্যুহারের পার্থক্য ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তনের অতিরিক্ত প্রভাব অনুমান করা হয়েছে।
গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এই সংখ্যা সরাসরি গণনা করা মৃত্যুসনদের তালিকা নয়। বরং তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি পরিসংখ্যানগত অনুমান। তাপ অনেক সময় সরাসরি মৃত্যুর কারণ হিসেবে নথিভুক্ত হয় না; বরং হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যাকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ইতালিতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—আনুমানিক ১৩ হাজার ৩০৩। এরপর রয়েছে ফ্রান্সে ৭ হাজার ২৬৮, স্পেনে ৬ হাজার ৮২৪ এবং জার্মানিতে ৬ হাজার ৩৪০টি মৃত্যু।
যুক্তরাজ্যে তাপের কারণে আনুমানিক ৪ হাজার ৩৫৪টি অকালমৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫টি মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে বলে গবেষকেরা অনুমান করেছেন।
বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ৫০২টি মৃত্যু ঘটেছে, যা মোট হিসাবের প্রায় ৪৫ শতাংশ। তবে তীব্র গরমের প্রভাব শুধু বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যেও আনুমানিক ছয় হাজার মৃত্যু ঘটেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
জুনের তাপপ্রবাহ ছিল বিশেষভাবে বিপজ্জনক
গবেষণায় ১৭ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত সময়কে বিশেষভাবে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই সময়ে অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৫.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। গবেষকদের হিসাবে, গ্রীষ্মের মোট তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সময়ের তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গ্রীষ্মের শুরুতেই তীব্র গরমের কারণে অনেক মানুষ পর্যাপ্তভাবে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। উচ্চ আর্দ্রতা, রাতের বেলায় তাপমাত্রা বেশি থাকা এবং ঘরবাড়িতে পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকাও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কী করা দরকার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের অনেক শহরের অবকাঠামো দীর্ঘস্থায়ী চরম তাপ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। তাই তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা, জনসাধারণের জন্য শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বয়স্ক, একা বসবাসকারী, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য নেই—এমন মানুষদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা, ছায়ায় থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিবেশী বা পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা আরও বলেছেন, তাপপ্রবাহের ক্ষতি কমাতে তাৎক্ষণিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত হ্রাস করা প্রয়োজন।
গবেষণার ফলাফল ইউরোপে চরম তাপের ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্যঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। তবে সংখ্যাগুলোকে গবেষণাভিত্তিক অনুমান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; শহরের বাইরের জনসংখ্যা অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় পুরো মহাদেশে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।





