রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনে প্রাণহানি, নভেম্বরে আবুধাবিতে শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি
রাশিয়ার ব্যাপক হামলায় ইউক্রেনে নিহত অন্তত চারজন। নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা হতে পারে।
রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে নভেম্বরের প্রথমার্ধে আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। তবে আলোচনার সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে হতাহত
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ একাধিক অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কিয়েভে ২১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। আবাসিক ভবন, জ্বালানি স্থাপনা, পরিবহন অবকাঠামো, রেলস্টেশন এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জেলেনস্কি অভিযোগ করেন।
খারকিভ অঞ্চলেও হামলায় প্রাণহানি ঘটে। লোজোভা শহরের একটি বাজারে রুশ হামলায় দুই নারী নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হন বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যান্য এলাকায়ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। শীতকাল সামনে আসায় এসব হামলা সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ, পানি ও গরম রাখার ব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও ইউক্রেনের সামরিক ও পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে।
নভেম্বরে আবুধাবিতে শান্তি আলোচনার পরিকল্পনা
যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা অব্যাহত থাকলেও কূটনৈতিক পর্যায়ে নতুন আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ২৩ অক্টোবর জানান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর নীতিগতভাবে আলোচনায় ফিরতে সম্মতি দিয়েছেন বলে ক্রেমলিন জানিয়েছে। আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে নির্ধারণ করা যায়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, তাঁর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনাকে সমর্থন করে। কিয়েভের অবস্থান হলো, আলোচনা যত দ্রুত সম্ভব শুরু হওয়া উচিত এবং এর লক্ষ্য হওয়া উচিত যুদ্ধের অবসান, যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া।
তবে আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির নিশ্চয়তা নয়। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একাধিক দফা আলোচনা হলেও যুদ্ধ বন্ধের প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দুই দেশের মধ্যে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
যুদ্ধের সামরিক পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে স্টারলিংক, নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ, ড্রোন পরিচালনা এবং বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রমে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
২৩ অক্টোবর প্রকাশিত গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, স্টারলিংক সংযোগে বিধিনিষেধ ও গতিসংক্রান্ত সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। এসব সমস্যার কারণে দ্রুতগতির সামরিক সরঞ্জাম এবং ড্রোন পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছেন।
স্যাটেলাইট যোগাযোগের ওপর নির্ভরতা ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় সংযোগের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যার সঙ্গে সাম্প্রতিক হামলায় হতাহতের সংখ্যার সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই পরিস্থিতি শান্তি আলোচনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ, নজরদারি এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আলোচনার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক সমর্থনের ভবিষ্যৎ নিয়েও কিয়েভের উদ্বেগ রয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধের পথে বড় বাধা
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে এখনো মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে। মস্কো যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো এবং ইউক্রেনের সামরিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে চায়। অন্যদিকে, কিয়েভ যুদ্ধবিরতি, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার হামলা প্রতিরোধে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন আলোচনার উদ্যোগ কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা অব্যাহত থাকা এবং দুই পক্ষের শর্তে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় আলোচনার ফলাফল নিয়ে সতর্কতা রয়েছে।
আবুধাবিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে আলোচনার মূল বিষয়, অংশগ্রহণকারীদের প্রতিনিধিত্বের স্তর এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির শর্ত আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে। আপাতত নিশ্চিত বিষয় হলো, নতুন আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; যুদ্ধের অবসান বা চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা নেই।





