সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রে হুথি হামলা, নিহত ভারতীয়, মার্কিন কর্মীদের সরানোর নির্দেশ
দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলায় এক ভারতীয় নিহত, আহত আটজন। ভারত হামলার নিন্দা জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকে অপ্রয়োজনীয় মার্কিন কর্মীদের সরানোর নির্দেশ।
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় হামলায় দুইজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিক। ঘটনার পর ভারত সরকার হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে সৌদি আরবে নিযুক্ত অপ্রয়োজনীয় মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
দাম্মাম বিমানবন্দরে প্রাণহানি
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় একজন সৌদি নাগরিক ও একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হন। আহত হন আরও আটজন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
হামলার পর বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়েছে এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। তবে নতুন হামলার আশঙ্কায় দেশটির বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২২ অক্টোবর সৌদি আরবের বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার নিন্দা জানায়। মন্ত্রণালয় জানায়, দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত এবং আরও দুই ভারতীয় আহত হয়েছেন। পৃথকভাবে সৌদি আরবের শায়বাহ তেলক্ষেত্রে হামলায় আরেক ভারতীয় নাগরিক আহত হন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে। রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয় নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ভারত সরকার বলেছে, বেসামরিক নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এসব হামলা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির জনগণ ও সরকারের পাশে থাকার কথাও জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
শায়বাহ তেলক্ষেত্রেও হামলা
বিমানবন্দরের ঘটনার পাশাপাশি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে অবস্থিত সৌদি আরামকোর শায়বাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্থাপনাটিকে লক্ষ্য করে আসা একটি ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত করার পর ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুইজন নিহত হন।
তেলক্ষেত্রটি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর অংশ। এ ধরনের স্থাপনায় হামলা হলে তেল উৎপাদন, পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। তবে হামলার কারণে তেল উৎপাদনে কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ মার্কিন কর্মীদের
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে থাকা অপ্রয়োজনীয় মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুথিদের হামলা বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, নতুন হামলার কারণে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এবং বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে এবং বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
এই নির্দেশের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবে থাকা সব মার্কিন নাগরিককে দেশ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। এটি মূলত অপ্রয়োজনীয় সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য।
আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রে হামলার ঘটনা ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনার নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। হুথিরা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের একটি প্রধান পক্ষ এবং ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে প্রতিটি হামলার দায়, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং সংশ্লিষ্টতার বিস্তারিত তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশে হামলা অব্যাহত থাকলে বিমান চলাচল, বাণিজ্যিক পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে সৌদি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ভারত তার নাগরিকদের সহায়তা দেওয়ার জন্য দূতাবাসের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও নিজস্ব কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন হামলা প্রতিরোধ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।





