ইরানে হামলার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের, ড্রোনে ইরান, ক্ষেপণাস্ত্রে শক্তি বাড়াচ্ছে সৌদি আরব
ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরই মধ্যে উন্নত আরাশ ড্রোন দেখিয়েছে তেহরান, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছে সৌদি আরব।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। একই সময়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তেহরান ও রিয়াদ। ইরান উন্নত সংস্করণের আরাশ আক্রমণকারী ড্রোন প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণের তথ্য সামনে এসেছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনা রয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ ও এনপিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য অভিযান নভেম্বরের শুরুতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, জ্বালানিশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং পারমাণবিক অবকাঠামো থাকতে পারে। তবে এসব লক্ষ্যবস্তু চূড়ান্ত হয়েছে কি না, কিংবা সামরিক অভিযান চালানোর জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো হবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা হয় না। একই সঙ্গে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রাখার কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইসরায়েলি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে। তবে যৌথ অভিযান চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত হামলায় অংশ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তাঁর দেশ কূটনীতি ও যুদ্ধ দুই পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত। ইরানের কর্মকর্তারা আরও সতর্ক করেছেন, দেশটির ওপর নতুন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও সংশ্লিষ্ট সামরিক স্থাপনাগুলো পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সম্ভাব্য নতুন হামলার খবরের মধ্যেই ইরানের সেনাবাহিনী আরাশ ড্রোনের উন্নত সংস্করণ প্রদর্শন করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন সংস্করণে ড্রোনটির ওয়ারহেড বা বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতা ৫০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ১০০ কেজি করার কথা জানানো হয়েছে।
ইরানি সামরিক সূত্রের দাবি, ড্রোনটির দিকনির্দেশনা ব্যবস্থায়ও উন্নতি আনা হয়েছে। এর ফলে উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থার সংকেত বাধাগ্রস্ত হলেও বিকল্প ব্যবস্থার সাহায্যে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও দেশটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেট ইঞ্জিনচালিত সংস্করণ তৈরির কাজ চলার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
আরাশ এক ধরনের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন। এটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে গিয়ে আঘাত হানে এবং আঘাতের সময় সাধারণত ধ্বংস হয়ে যায়। তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ চালানোর সম্ভাবনার কারণে এ ধরনের ড্রোন আধুনিক সামরিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ড্রোনটির নতুন সংস্করণের পাল্লা, নির্ভুলতা, উৎপাদনের পরিমাণ এবং বাস্তব যুদ্ধে কার্যকারিতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে ইরানের ঘোষিত প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে দেশটির নিজস্ব দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সৌদি আরবের আল-দাওয়াদিমি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের দুই গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডয়টসম্যান বাণিজ্যিক উপগ্রহচিত্র পর্যালোচনা করে এই মূল্যায়ন করেছেন।
গবেষকেরা ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তোলা উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে কমপ্লেক্সটিতে নতুন ভবন ও সম্ভাব্য উৎপাদন অবকাঠামোর উপস্থিতি দেখা গেছে। একটি ভবনে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন কাঠামো রয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। আরেকটি ভবন সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
সম্প্রসারণের কাজ শেষ হলে স্থাপনাটি আরও বড় ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে অথবা আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হতে পারে। তবে উৎপাদন ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, এমন নিশ্চিত তথ্য নেই। গবেষকদের অনুমান, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেখানে উৎপাদন শুরু হতে পারে। স্থাপনাটির সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে চীনের ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সৌদি আরব ও চীনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের ড্রোন উন্নয়ন, সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের সামরিক উপস্থিতিও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।
সৌদি আরবের জন্য নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সামরিক আত্মনির্ভরতা ও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করার কৌশলের অংশ হতে পারে। অন্যদিকে, ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা এবং সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর এসব উদ্যোগ থেকে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নতুন হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামরিক পরিস্থিতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
এ অঞ্চলে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জাহাজ চলাচল, তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে সংঘাতের মাত্রা, সরবরাহব্যবস্থার অবস্থা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা, ইরানের উন্নত ড্রোন প্রদর্শন এবং সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র সম্প্রসারণ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ঘটনা। তবে এখন পর্যন্ত নতুন হামলার চূড়ান্ত অনুমোদন কিংবা এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি সমন্বয়ের বিষয়টি নিশ্চিত নয়। পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সিদ্ধান্ত ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর।





