মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই অভ্যুত্থান! তিন অর্জনের ট্রফিই বিএনপির ঘরে: মীর শাহে আলম
বগুড়ায় ১৬১ শিক্ষকের সঙ্গে মতবিনিময়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের মর্যাদা, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের মতামত, সমস্যা ও প্রস্তাব সরাসরি শুনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি। বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলার নির্বাচিত ১৬১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে মতবিনিময় করেছেন তিনি। সভায় শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যা, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষার্থীদের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই উপজেলার শিক্ষকদের মধ্য থেকে পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ১৬১ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। সভায় শিক্ষকদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন প্রতিমন্ত্রী এবং তাঁদের বিভিন্ন প্রস্তাব ও সমস্যার কথা নিজ হাতে নোট করেন। জাইমা রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে নির্বাচিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জাইমা রহমানের ছবি সংবলিত মগও উপহার দেওয়া হয়।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মীর শাহে আলম বলেন, সমাজের প্রতিটি পেশার দক্ষ মানুষ তৈরির পেছনে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতায় না থাকায় শিক্ষকদের অবহেলার বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছে। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার উন্নয়ন শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে মানসম্মত শিক্ষা পায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং বাস্তবসম্মত সমাধান নেওয়া সম্ভব হয়—সে জন্য শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের মতবিনিময়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো সরাসরি জানার সুযোগ তৈরি হয় বলেও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তব্যের একপর্যায়ে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। স্বাধীনতার ঘোষণার সময় ও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রচলিত বয়ানের সমালোচনা করেন। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে তাঁর বক্তব্যগুলো রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার অংশ; এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও বিবরণ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমানের শাসনামল প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম বলেন, তিনি বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জিয়াউর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ওয়ান-ইলেভেনের সরকার এবং শেখ হাসিনার সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময়গুলোতে দেশে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক প্রবণতা জোরদার হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে উত্তরণের দায়িত্ব বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ওপর রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রসঙ্গে মীর শাহে আলম দাবি করেন, তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বৈরাচারের সময় রিজার্ভ ছিল ২০ বিলিয়ন ডলার। পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা ২৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় এবং বর্তমান সরকার সাত মাসে রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে এসব পরিসংখ্যান ও বিনিয়োগসংক্রান্ত দাবির নির্ভুলতা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
দেশের চলমান সংকটের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং জনগণের ভোগান্তি কমানোর বিষয়গুলো উঠে আসে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে বক্তব্যে মীর শাহে আলম অভিযোগ করেন, তেল ও গ্যাসের সংকটকে বড় করে দেখাতে আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দলের একটি অংশ যোগসাজশ করে পরিকল্পিতভাবে পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে প্রচার করিয়েছে। তাঁর দাবি, তেলের দাম কিছুটা বাড়ার পর প্রায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ ঘটনাকে তিনি পরিকল্পিত চক্রান্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য সভার সরবরাহ করা বিবরণে নেই।
বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান—দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অর্জনের সঙ্গেই বিএনপির ভূমিকা জড়িত। তিনি বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের আন্দোলনে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগেরও ভূমিকা ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। জুলাইয়ের আন্দোলনেও বিএনপি ও জামায়াতের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির তারেক রহমানকে জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে দাবি করেন মীর শাহে আলম। এ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিএনপির ঘরে দেশের সেরা তিনটি অর্জনের ট্রফিই রয়েছে। তাঁর ভাষায়, তিনটি ঐতিহাসিক অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি দলকে পতনের হুমকি দিয়ে লাভ হবে না। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বিএনপির রাজনৈতিক অবদান ও দলটির অবস্থানের পক্ষে নিজের মত তুলে ধরেন।
সভায় শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। মীর শাহে আলম বলেন, শিক্ষকদের দায়িত্ব কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সমাজের অনিয়ম, অসংগতি ও অপরিচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতেও তাঁদের ভূমিকা রাখতে হবে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নৈতিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা এবং মানবিক আচরণ প্রতিষ্ঠায় শিক্ষকেরা নেতৃত্ব দিতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত না করে মানবিক, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও মূল্যবোধ বিকাশের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে হবে।
মতবিনিময় সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাব শোনা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে করণীয় চিহ্নিত করা। তবে সভায় আলোচিত প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেগুলোর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও সময়সীমা সম্পর্কে সরবরাহ করা বিবরণে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।





