হ্যালোইনে খরগোশ সাজতে চেয়েছিল ওরেগনের স্কুলে নিহত পাঁচ বছরের শিশু রোয়াম সামার
৯,৭৪৫ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের বেন্ড শহরের সিলভার রেইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ১৫ অক্টোবর ঘটে যাওয়া ভয়াবহ গুলির ঘটনায় প্রাণ হারায় পাঁচ বছরের শিশু রোয়াম সামার। আসন্ন হ্যালোইন উৎসবে খরগোশের পোশাক পরার পরিকল্পনা ছিল তার। পরিবারের সঙ্গে কুমড়ার বাগানে যাওয়া, ঘোড়ায় চড়া শেখা এবং নতুন নতুন গল্প তৈরি করাও ছিল তার স্বপ্নের অংশ। কিন্তু বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর হামলায় সেই স্বপ্নগুলো চিরতরে থেমে গেছে। সন্তানের মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়া বাবা কেলিক সামার ও মা লিলিয়ান সামার সম্প্রতি তাঁদের সন্তানের স্মৃতি, ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অপূর্ণ থেকে যাওয়া আশাগুলোর কথা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন যাচাই করে এসব তথ্য জানা গেছে।
রোয়ামের বাবা-মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের ছেলে ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, দয়ালু এবং অন্যকে সাহায্য করতে ভালোবাসত। তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। এই বয়সেই সে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি পরিচিত মানুষদের সঙ্গে নিজের আনন্দ ভাগ করে নিতে চাইত। বাড়িতে কেউ এলে তাকে পানীয়, খাবার কিংবা খেলনা দেওয়ার চেষ্টা করত। বাবা-মায়ের কাছে রোয়াম ছিল এমন একটি শিশু, যার হৃদয়ে অন্যদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতার কোনো সীমা ছিল না।
সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাবা-মা জানিয়েছেন, রোয়াম ছোটবেলা থেকেই নিজের মতো করে পৃথিবীকে চিনতে ভালোবাসত। রংধনু ও কাল্পনিক প্রাণীর প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। একশৃঙ্গ ঘোড়ার মতো কল্পনার প্রাণী, হাঙর, ডাইনোসর এবং বড় দাঁতওয়ালা নানা জীব নিয়ে গল্প বানাতে পছন্দ করত সে। এসব প্রাণীকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তাদের বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়ার প্রয়োজন রয়েছে—এমন ভাবনাও তার গল্পে উঠে আসত। তার পরিবারের কাছে এই স্মৃতিগুলো এখন গভীর বেদনার পাশাপাশি সন্তানের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করছে। যে শিশুটি পৃথিবীর নানা প্রাণী নিয়ে গল্প তৈরি করত, সে নিজেই ছিল একটি পরিবারের আনন্দ, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ আশার কেন্দ্রবিন্দু। বাবা-মা জানিয়েছেন, তাঁদের ছেলে বড় হয়ে কী করত, কী শিখত এবং কীভাবে নিজের পৃথিবী গড়ে তুলত, তা দেখার জন্য পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। রোয়ামের মৃত্যুর ঘটনাটি শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, পুরো বেন্ড শহরের মানুষের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সিলভার রেইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্দুকধারীর হামলায় তিন শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষকের মৃত্যু হয়। নিহত শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল পাঁচ, আট ও এগারো বছর। নিহত শিক্ষকের নাম মেগান ল্যামবার্ট, বয়স ২৫ বছর। হামলায় আরও এক শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষক আহত হন। তাঁদের মধ্যে সাত বছর বয়সী এক শিশু এবং ৫৪ বছর বয়সী শিক্ষক বেকি ড্রুরি ছিলেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারী ছিল ১৬ বছর বয়সী গ্রিফিন জে জন দ্বিতীয়। সে আগে ওই বিদ্যালয়ে বিশেষ সহায়তাপ্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনা করেছিল, তবে ঘটনার সময় স্থানীয় বিদ্যালয় জেলায় তার বর্তমান ভর্তি ছিল না। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে একটি বন্দুক নিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে গুলি চালায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলাকারী বিদ্যালয়ের তালাবদ্ধ প্রবেশপথের কাচ ভেঙে ভেতরে ঢোকে। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে সে একাধিকবার গুলি চালায়। এ সময় এক শিক্ষক হামলাকারীকে থামানোর চেষ্টা করেন। পুলিশপ্রধানের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, ওই শিক্ষক তাঁর মুঠোফোন ছুড়ে হামলাকারীকে বাধা দেন এবং পরে তাকে মাটিতে ফেলে প্রতিরোধ করেন। এরপর বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর বাবা কায়লুব জিয়ামানকো সেখানে প্রবেশ করে হামলাকারীকে গুলি করেন। ঘটনাস্থলেই হামলাকারীর মৃত্যু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই শিক্ষক ও অভিভাবকের দ্রুত পদক্ষেপের ফলে আরও প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনার পর থেকে তদন্তকারীরা হামলার উদ্দেশ্য, বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং হামলাকারীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছানোর বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় ব্যবহৃত বারো নলবিশিষ্ট গুলিবর্ষণযোগ্য অস্ত্রটি হামলাকারীর মা কিনেছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ অস্ত্র কীভাবে একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে পৌঁছাল এবং কেন বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ভেঙে হামলাকারী শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে পারল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
রোয়ামের বাবা-মা সন্তানের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য শোকাহত মানুষদের একটি বিশেষ অনুরোধ করেছেন। তাঁরা চান, মানুষ যেন তাঁদের ছেলেকে স্মরণ করতে ছবি আঁকে, ছবি রং করে কিংবা নিজের হাতে শিল্পকর্ম তৈরি করে। তাঁদের মতে, রোয়াম নিজেও ছবি আঁকা, নানা কিছু তৈরি করা এবং কল্পনার গল্প বলতে ভালোবাসত। নিখুঁত ছবি আঁকা তার কাছে বড় বিষয় ছিল না; বরং নিজের মতো করে কিছু তৈরি করার আনন্দই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের এই আহ্বান শোককে সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি প্রচেষ্টা। তাঁরা চান, রোয়ামের স্মরণে তৈরি ছবিগুলোয় হাঙর, ডাইনোসর, দানব কিংবা অন্য কোনো কল্পিত প্রাণী স্থান পাক। কারণ, এসব প্রাণীকে ঘিরেই সে নিজের গল্প তৈরি করত এবং বন্ধুত্বের গুরুত্ব তুলে ধরত। পরিবারের কাছে সন্তানের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কেবল তার মৃত্যুর কথা মনে করা নয়, বরং সে যে আনন্দ, কৌতূহল ও মমতা ছড়িয়ে দিয়েছিল, সেগুলোকেও ধারণ করা।
রোয়ামের খালা সোয়ান শেরিডানও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিশুটি ছিল প্রচণ্ড চঞ্চল। সে দ্রুত দৌড়াতে পারত, নির্ভয়ে বিভিন্ন জায়গায় উঠে পড়ত এবং বই পড়তে ভালোবাসত। খেলনা প্রাণীগুলোর প্রতিও তার ছিল বিশেষ মায়া। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো খেলনা প্রাণীকে অবহেলিত মনে হলে সেটিকে যত্ন করার চেষ্টা করত সে। বিশেষ করে সামুদ্রিক প্রাণীর খেলনা তার খুব প্রিয় ছিল। তার এই স্বভাব পরিবারের কাছে এমন এক শিশুর ছবি তুলে ধরে, যে নিজের ছোট্ট জগতে অন্যদের যত্ন নেওয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করত। এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক সামনে এনেছে। শিশুদের নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া, শ্রেণিকক্ষে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করা এবং দিন শেষে পরিবারের কাছে ফিরে আসা—এগুলোই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বিদ্যালয়ের ভেতরে এমন প্রাণঘাতী হামলা সেই নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার, ঘটনার পূর্ণ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে। রোয়ামের বাবা-মায়ের জন্য অবশ্য এসব আলোচনা তাঁদের সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। যে শিশুটি কয়েক দিন পর খরগোশের পোশাক পরে আনন্দ করার কথা ভেবেছিল, তার জন্য আর কোনো উৎসবের পোশাক কেনা হবে না। যে শিশুটি পরিবারের সঙ্গে কুমড়ার বাগানে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তার সেই ভ্রমণ আর হবে না। যে শিশুটি বড় হয়ে নতুন নতুন গল্প বলার স্বপ্ন দেখত, তার গল্পগুলো এখন স্মৃতির ভেতরেই বেঁচে থাকবে।