হরমুজ সংকটেও ইরাকের তেল রপ্তানি দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল ছাড়াল, বিকল্প রুটে বাড়ছে সরবরাহ
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের মধ্যেও তুরস্ক ও সিরিয়ার বিকল্প পথ ব্যবহার করে অক্টোবরে ইরাকের তেল রপ্তানি দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি সত্ত্বেও ইরাকের তেল রপ্তানি আবারও দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়েছে। দেশটির তেলমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ খুদাইর ১৯ অক্টোবর জানিয়েছেন, চলতি অক্টোবর মাসে গড় রপ্তানির পরিমাণ দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি তুরস্কের সেহান বন্দর এবং সিরিয়ার মধ্য দিয়ে স্থলপথে তেল পরিবহন এই পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখছে।
ইরাকের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো অপরিশোধিত তেল রপ্তানি। সরকারি আয়ের বড় অংশ এই খাত থেকে আসে। ফলে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে প্রধান রপ্তানি পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির রাজস্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহার করে রপ্তানি বাড়ানো এখন বাগদাদের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
তিনটি পথে তেল রপ্তানি
ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটি তিনটি প্রধান পথ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করছে। প্রথমটি হলো পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজে তেল পাঠানো। দ্বিতীয়টি হলো উত্তরের পাইপলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় সেহান বন্দরে তেল পৌঁছানো। তৃতীয়টি হলো ট্যাংকার ট্রাকে করে সিরিয়ার বন্দর ও সংরক্ষণকেন্দ্রে তেল পরিবহন।
ইরাকের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থা SOMO এসব রপ্তানি কার্যক্রম সমন্বয় করছে। দেশটির তেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন বাজারে ইরাকি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে ইরাকের দৈনিক তেল রপ্তানি প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। অক্টোবরে তা বেড়ে ৩৪ লাখ ব্যারেলের ওপরে উঠেছে। যুদ্ধের আগে ইরাকের দৈনিক রপ্তানি প্রায় ৩৭ লাখ ব্যারেল ছিল। ফলে বর্তমান পরিসংখ্যান দেশটির রপ্তানি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির সংকটের প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের কারণে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় তেল রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
তেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ইরাকের তেল রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৯ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি। মার্চে তা নেমে আসে প্রায় ১৮ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেলে। এই পতন দেশটির অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করে।
সংকট মোকাবিলায় ইরাক বিকল্প পথ ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে কুর্দিস্তান অঞ্চলের মধ্য দিয়ে তুরস্কের সেহান বন্দরে কিরকুক অঞ্চলের তেল পাঠানো আবার শুরু হয়। পাশাপাশি সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ট্যাংকার ট্রাকে তেল পরিবহন বাড়ানো হয়।
তবে বিকল্প পথগুলো এখনো হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ বিকল্প হয়ে ওঠেনি। ইরাকের অধিকাংশ তেল এখনো দক্ষিণাঞ্চলীয় উৎপাদনকেন্দ্র থেকে আসে, আর এসব তেলের বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় বন্দর ব্যবহার করে রপ্তানি করা হয়।
তুরস্ক ও সিরিয়ার রুট কতটা গুরুত্বপূর্ণ
তুরস্কের সেহান বন্দর ইরাকের উত্তরের তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এই পথে তেল ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর পর ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা যায়।
অন্যদিকে সিরিয়ার মধ্য দিয়ে তেল পরিবহন তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও সংকটের সময় এটি অতিরিক্ত বিকল্প তৈরি করেছে। ট্যাংকার ট্রাকে তেল নিয়ে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরের কাছাকাছি সংরক্ষণকেন্দ্রে পৌঁছে তা জাহাজে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে স্থলপথে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনে খরচ, সড়কের সক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বন্দর অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে ইরাক।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে
ইরাকের রপ্তানি বাড়লে সরকারের রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা উন্নত হতে পারে। তেল বিক্রির আয় দিয়ে দেশটি সরকারি কর্মচারীদের বেতন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জনসেবা পরিচালনা করে।
তবে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেই আয় একই অনুপাতে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে নেওয়া মূল্য—সবকিছুই চূড়ান্ত আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের কারণে পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইরাকি তেল কিছু ক্ষেত্রে ছাড়মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাৎপর্য
ইরাকের রপ্তানি পুনরুদ্ধার আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। বিকল্প পথ ব্যবহার করে ইরাক সরবরাহ বজায় রাখতে পারলে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
তবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ চলাচল, তেলের পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহের নিশ্চয়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরাকের দৈনিক তেল রপ্তানি ৩৪ লাখ ব্যারেল ছাড়ানো দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তুরস্ক ও সিরিয়ার বিকল্প পথ সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং বিকল্প পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।





