আলবেনিয়ায় বিক্ষোভে সহিংসতা, পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে আগুন, উত্তাল রাজধানী তিরানা
৯,৬৪৪ বার পড়া হয়েছে ৫ মিনিটে পড়ুন
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের একপর্যায়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। তবে ওই কর্মকর্তার আঘাতের মাত্রা, তাঁর পরিচয় এবং ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বার্তা সংস্থা ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে তিরানায় বিক্ষোভের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ১৪ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ সরকারি ভবন, ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। পরবর্তী দিনগুলোতেও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। ১৮ অক্টোবর রাজধানীর একটি পুলিশ কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের খবরও প্রকাশিত হয়। আলবেনিয়ার পুলিশপ্রধানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানায়, তিরানার তিন নম্বর পুলিশ কার্যালয়ের ভবনে হামলার সময় পেট্রলবোমা, আতশবাজি, পাথর ও অন্যান্য শক্ত বস্তু ব্যবহার করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে পুলিশপ্রধান জানান। আহতদের মধ্যে কতজনের অবস্থা গুরুতর, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তিরানার রাস্তায় বিক্ষোভ চলাকালে এক পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে আগুন ধরে যায়। একই সময়ে বিক্ষোভকারীদের পেট্রলবোমা ও পাথর নিক্ষেপের খবরও সামনে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং রাবারের গুলি ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তার শরীরে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। তাই ঘটনাটিকে ঘিরে প্রচারিত সব দাবি নিশ্চিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আন্দোলনের পেছনে শুধু একটি বিষয় নয়, বরং একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার অভাব এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তাঁদের ভবিষ্যৎকে কঠিন করে তুলেছে। অনেক তরুণ মনে করছেন, শিক্ষা শেষ করেও উপযুক্ত চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ নতুন করে রাজপথের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনের আরেকটি বড় কারণ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছে। তাঁদের অভিযোগ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষের সমস্যা যথাযথভাবে সমাধান হচ্ছে না। তবে এসব অভিযোগের সবকিছু আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। অভিযোগ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
আন্দোলনের সঙ্গে দক্ষিণ আলবেনিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রস্তাবিত একটি বিলাসবহুল পর্যটন প্রকল্প নিয়েও বিতর্ক জড়িয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট এই প্রকল্প নিয়ে জমির মালিকানা ও সম্ভাব্য অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জমি হস্তান্তর নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তবে প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রতিটি দিক প্রমাণিত নয়। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে কুশনারের ব্যক্তিগতভাবে কোনো অন্যায় করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়টি আন্দোলনের বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের একটি অংশ হলেও বর্তমান বিক্ষোভের একমাত্র কারণ এটি নয়।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও আলবেনিয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি ভবন ও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুর ঠেকাতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে রাবারের গুলির মতো বস্তু ব্যবহারের দৃশ্য দেখা যায়। ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদেরও রাবারের গুলি আঘাত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলবেনিয়ার পুলিশপ্রধান স্কেন্দের হিতা বলেছিলেন, ব্যবহৃত বলপ্রয়োগের উপায়গুলো সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আনুপাতিকতার নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে সাত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্তের কথা জানানো হয়।
এই পরিস্থিতিতে আহত ব্যক্তির সংখ্যা ও গ্রেপ্তারের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৪ অক্টোবরের সংঘর্ষ নিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২৩ জন পুলিশ সদস্য এবং ছয়জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন। ওই ঘটনায় ৩৫ জনকে আটক করার তথ্যও প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে, ১৭ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে পুলিশপ্রধানের বরাত দিয়ে বলা হয়, তখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৩৮৮ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা-সংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এগুলো ভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হিসাব; তাই সব সংখ্যা একত্র করে একই সময়ের মোট আহত বা গ্রেপ্তার ব্যক্তির সংখ্যা হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
আলবেনিয়ার সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন রাজপথের সংঘর্ষের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলা—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। বিক্ষোভের নামে সহিংসতা যেমন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সম্পদের জন্য হুমকি, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। কোনো পক্ষের বক্তব্য যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রচার করলে পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। আলবেনিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা তিরানার সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং অতিরিক্ত পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সব পক্ষকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে, আলবেনিয়ার রাজধানীতে চলমান বিক্ষোভ এখন কেবল শিক্ষার্থীদের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী ক্ষোভ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরকারের পদত্যাগের দাবি যুক্ত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে আগুন লাগার খবর সহিংসতার ভয়াবহতা সামনে এনেছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, আহত কর্মকর্তার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও তদন্তের ফল প্রয়োজন। পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য বিক্ষোভকারীদের নিরাপদে মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা, সহিংসতা বন্ধ করা এবং অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত করা জরুরি।